ধর্ষকের ‘লিঙ্গচ্ছেদ’ ও ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড’ চেয়েও কেন আইন করতে পারেননি ইমরান খান?
Featured, Latest, News, Popular, Trending #abongtv, #AntiRapeLaw, #HumanRights, #ImranKhan, #JusticeForRamisa, #PakistanPoliticsরাজধানী ঢাকার পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। প্রধান অভিযুক্ত জাকির ও তার স্ত্রী স্বপ্না গ্রেফতার হলেও, অতীতে বিভিন্ন আলোচিত ধর্ষণ মামলার দীর্ঘসূত্রতা দেখে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—আদৌ কি দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হবে? বিচার ব্যবস্থার এমন ধীরগতির আলোচনার মধ্যেই আবার সামনে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর আইন প্রণয়নের চেষ্টা করা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উদ্যোগের কথা। ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদ ও প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোরতম বিধান চালু করতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত তা পারেননি তিনি।
কী ছিল ইমরান খানের সেই ঐতিহাসিক বিলে?
২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাহোরের একটি মহাসড়কে দুই সন্তানের সামনে এক নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায় পাকিস্তানে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ শুরু হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আরিফ আলভি ‘অ্যান্টি রেপ অর্ডিন্যান্স’ অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেন।
ইমরান খানের প্রস্তাবিত এই বিলে বিধান রাখা হয়েছিল—অপরাধী প্রথমবার হোক বা বারবার, ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত হলেই রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে তার যৌনাঙ্গ কেটে দেওয়া (Chemical Castration) হবে। এছাড়াও অপরাধীকে ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার কঠোর প্রস্তাব করেছিলেন ইমরান খান। এই আইনে বিশেষ দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে মাত্র ১২০ দিন বা চার মাসের মধ্যে মামলার রায় দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি তদন্তে গাফিলতি করা পুলিশ কর্মকর্তাদের ৩ বছরের জেল এবং ভুক্তভোগী নারীর পরিচয় গোপন রাখার কঠোর বিধানও যুক্ত ছিল।
যে কারণে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয় ইমরান খানকে:
২০২১ সালের নভেম্বরে বিলটি যখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে চূড়ান্তভাবে পাস হয়ে ‘অ্যান্টি রেপ অ্যাক্ট-২০২১’ আইনে পরিণত হয়, তখন মানবাধিকার কর্মী এবং ইসলামিক স্কলারদের তীব্র চাপের মুখে ‘লিঙ্গচ্ছেদ’ ও ‘প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড’-এর বিধান দুটি বাদ দিতে বাধ্য হয় সরকার।
পাকিস্তানের ইসলামিক মতাদর্শিক কাউন্সিল (Council of Islamic Ideology) স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রাসায়নিক প্রয়োগে কোনো মানুষকে খোঁজা বা লিঙ্গচ্ছেদ করা ইসলাম-সম্মত নয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ এ ধরনের সাজার বিরোধিতা করে ধর্ষণের মূল কারণ খুঁজে বের করার তাগিদ দেয়। ফলে চূড়ান্ত আইনে দ্রুত বিচারের ধারাটি অপরিবর্তিত থাকলেও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে কেবল সাধারণ মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। উল্লেখ্য, রয়টার্সের তথ্যমতে ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, পোল্যান্ড এবং আমেরিকার কিছু রাজ্যে এখনো লিঙ্গচ্ছেদের মতো কঠোর শাস্তি কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশের আইন ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা:
বাংলাদেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’ (সংশোধিত) অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষের কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটে না। গত ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক অধ্যাদেশে তদন্তের জন্য ১৫ দিন এবং বিচারের জন্য ৯০ দিন নির্ধারণ করলেও রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে।
এর বড় উদাহরণ ১৮ বছর আগের আলোচিত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মামলা। ১১ নারীকে ধর্ষণের পর পরিচালনাকারী রসু খাঁর ফাঁসির আদেশ হাইকোর্টে বহাল থাকলেও ১১ বছর ধরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর আটকে আছে। একইভাবে ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিম্ন আদালতে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও আপিলের বেড়াজালে আটকে আছে চূড়ান্ত বিচার।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন জানান, অপরাধ দমনে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ‘দ্রুত শাস্তির নিশ্চয়তা’ বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, “একজন অপরাধী যখন জানবে অপরাধ করলে তাকে নিশ্চিত এবং দ্রুত শাস্তি পেতে হবে, তখন অপরাধ এমনিতেই কমে আসবে। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও রায় কার্যকর হতে অতিরিক্ত সময় লাগার কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সাহস পায়। আইন অনুযায়ী কম সময়ে শাস্তি নিশ্চিত করাই এই সংকটের একমাত্র সমাধান।”
