লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের পরিকল্পিত সামরিক অভিযান দিন দিন আরও জটিল ও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। একদিকে হিজবুল্লাহর উন্নত প্রযুক্তি ও নিখুঁত ড্রোন হামলা, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের তীব্র কূটনৈতিক চাপ— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে ইসরাইলের সামরিক কৌশল কার্যত পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।

পরিস্থিতি কতটা বেগতিক, তার প্রমাণ মেলে গত সোমবার। ওই দিন সকালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লেবাননের রাজধানী বৈরুতের উপকণ্ঠে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর জোরালো হুমকি দিলেও, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসে তেল আবিব। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নাটকীয় পিছু হটার ঘটনা প্রমাণ করে যে ইসরাইল এখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে মারাত্মকভাবে আটকে গেছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ লেবাননে একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বাফার জোন’ গড়ে তোলা এবং হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেওয়া; যাতে করে উত্তর ইসরাইলের বাসিন্দারা ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেন। তবে হিজবুল্লাহর ব্যবহার করা নতুন ধরনের ফাইবার-অপটিক নিয়ন্ত্রিত ‘ফার্স্ট-পারসন-ভিউ’ (FPV) ড্রোন ইসরাইলি বাহিনীর সামনে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই ড্রোনগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো— এগুলোকে প্রচলিত কোনো ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় বা দিকভ্রান্ত করা যায় না। হিজবুল্লাহ এই অপরাজেয় ড্রোনগুলো ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে দক্ষিণ লেবাননে অনুপ্রবেশ করা ইসরাইলি সেনা ও কমান্ডারদের নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার এমনই এক ড্রোন হামলায় ২ ইসরাইলি সেনা নিহত এবং ১০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অর্না মিজরাহি এই প্রসঙ্গে বলেন, “ইসরাইলের একটি নির্দিষ্ট সামরিক কৌশল ছিল, কিন্তু হিজবুল্লাহর ড্রোন পরিস্থিতি পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ইসরাইল প্রথমে হিজবুল্লাহর এই আকাশপথের অস্ত্রকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি।”

কূটনৈতিক ফ্রন্টে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক উত্তেজনা কমিয়ে আনার একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখার জন্য তেল আবিবের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে বৈরুতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ আন্তর্জাতিক এলাকায় বড় ধরনের বিমান হামলা চালানোর বিষয়ে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।

বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ইসরাইল এখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। তারা একদিকে হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি দমন বা নির্মূল করতে পারছে না, অন্যদিকে সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার মতো এক আত্মঘাতী ঝুঁকিতে পড়ছে। অবসরপ্রাপ্ত ইসরাইলি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাফ ওরিয়ন এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করে বলেন, ১৯৮২ সালে লেবানন আক্রমণের পর যে দীর্ঘমেয়াদি জটিল ও রক্তাক্ত যুদ্ধে ইসরাইল জড়িয়ে পড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তেল আবিবের জন্য ঠিক সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতারই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

তবে এই কৌশলগত অচলাবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। সামরিক মহলের একাংশ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া এই সীমাবদ্ধতার কারণে হিজবুল্লাহ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। আবার অন্য অংশের মতে, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যদি একটি কার্যকর ও টেকসই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের জন্যই বেশি লাভজনক হবে এবং দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতির বোঝা থেকে তারা রক্ষা পাবে।

সামগ্রিকভাবে, কয়েক মাস আগে যে লেবানন অভিযানকে ইসরাইল অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত সাফল্যের পথ মনে করেছিল, তা এখন এক অন্তহীন অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে হিজবুল্লাহ এখনও কার্যকর ও মারাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে এবং এই যুদ্ধের দ্রুত কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক সমাধানের স্পষ্ট লক্ষণ এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *