গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় এসে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর, সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান৷ আজ সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিশেষ আমন্ত্রণে এক উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি কুয়ালালামপুর পৌঁছান৷ সেখানে তাঁকে দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য তিনি মালয়েশিয়া সরকার ও সে দেশের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন৷

ফোনালাপের স্মৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মরণ: দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মরণ করেন যে, বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম যে আন্তর্জাতিক নেতার অভিনন্দন বার্তা ও ফোন তিনি পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম৷ সেই ফোনালাপেই তাঁকে মালয়েশিয়া সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ নিজের প্রথম বিদেশ সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দ ও সম্মানিত বোধ করছেন বলে উল্লেখ করেন৷

প্রধানমন্ত্রী এই সফরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে আরও বলেন, তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন, যা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং শ্রম সহযোগিতার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিল৷ একইভাবে তাঁর মাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল৷

বহুমাত্রিক খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগের আহ্বান: দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার এই বিশেষ বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি রপ্তানি, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়৷ উভয় নেতাই বিদ্যমান যৌথ কমিশন বৈঠক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও জোরদার করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন৷

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশীয় নেতৃবৃন্দকে জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত অবাধ, সুষ্ঠু ও ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের শক্তিশালী ও অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট পেয়েছে৷ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের প্রধানতম লক্ষ্যই হলো ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা৷ তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগের এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মালয়েশিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়ীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান৷

শ্রমবাজারের সংস্কার ও আঞ্চলিক কূটনীতি: মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান৷ তিনি মালয়েশিয়ায় আরও বেশি পরিমাণে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য দেশটির সরকারকে বিশেষ অনুরোধ জানান৷ এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করা, সেখানে অবস্থানরত অনিয়মিত শ্রমিকদের সহজ প্রক্রিয়ায় বৈধকরণ এবং বিভিন্ন কারণে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে টেবিলে উত্থাপন করেন৷ উভয় দেশই সিন্ডিকেটমুক্ত একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও স্বল্প ব্যয়সম্পন্ন আধুনিক শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে৷

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আশ্রিত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মালয়েশিয়ার অব্যাহত ভূ-রাজনৈতিক সমর্থনের ভূয়সী প্রশংসা করেন৷ এছাড়া তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর (ASEAN) সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশকে আসিয়ানের ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হিসেবে দ্রুত অন্তর্ভুক্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এবং আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে (RCEPI) যোগদানের আগ্রহও তুলে ধরেন৷

আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ: বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়েও দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়৷ জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় মুসলিম উম্মাহ ও বৈশ্বিক শান্তিতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন দুই নেতা৷ একই সাথে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভাপতিত্বের পদের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় মালয়েশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান৷

এই ঐতিহাসিক সফরকালে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় দলিল ও সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর ও পারস্পরিক বিনিময়কে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সময়োপযোগী উদ্যোগ দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করবে৷ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর স্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের ভাবগম্ভীর আমন্ত্রণ জানান এবং বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ তাঁদের সাদর অভ্যর্থনা জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে৷

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *