আটলান্টায় হ্যারি কেইনের জোড়া গোলের জাদু; কঙ্গোকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ড

একটি গোলে মুহূর্তেই হাজারো কণ্ঠ স্তব্ধ, আবার একটি গোলেই নিভু নিভু বিশ্বাসে নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠা— ফুটবল মহাবিশ্বের গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থে আটলান্টার রাতটা ছিল ঠিক তেমনই৷ ফুটবল তার চিরায়ত সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসল আরেকবার৷ ম্যাচের শুরুতে ব্রায়ান কিপেঙ্গার বজ্রগতির শটে আফ্রিকান দেশ ডিআর কঙ্গোর রূপকথার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল, যার ফলে ইংল্যান্ডের গ্যালারিতে তখন নেমে এসেছিল অস্বস্তির নীরবতা৷ মনে হচ্ছিল, আরেকটি ঐতিহাসিক অঘটনের গল্পই লেখা হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে৷ কিন্তু বড় দলগুলো যে বিপর্যয় থেকে ফিরে আসার মহাকাব্যিক চরিত্রে অনন্য, তার ব্যতিক্রম হলো না এবারও৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠের ছন্দের ঝংকার তোলে থ্রি লায়ন্স, আর ত্রাণকর্তা ও নায়ক হয়ে ওঠেন ‘নাম্বার নাইন’ হ্যারি কেইন৷ তাঁর অসামান্য জোড়া গোলে স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায় ডিআর কঙ্গোর, ২-১ ব্যবধানে অবিস্মরণীয় জয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করল টমাস টুখেলের দল৷

শুরুতেই কঙ্গোর চমক ও প্রথমার্ধের বিতর্ক: ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল, ডিআর কঙ্গো শুধু অংশ নিতে মাঠে নামেনি, ইতিহাস গড়ার অদম্য স্বপ্ন নিয়েই খেলতে এসেছে৷ সাহসী হাই-প্রেসিং, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ আর উইং ব্যবহার করে শুরু থেকেই শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে চেপে রাখে আফ্রিকার দলটি৷ সেই সাহসের পুরস্কারও তারা পেয়ে যায় মাত্র সপ্তম মিনিটে৷ মাঝমাঠ থেকে ভেসে আসা একটি লম্বা পাসে ইংল্যান্ডের রক্ষণে তৈরি হয় সামান্য ফাঁক৷ সেই সুযোগই দারুণ দক্ষতায় লুফে নেন ব্রায়ান কিপেঙ্গা৷ ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে নিকট পোস্ট লক্ষ্য করে নেওয়া তাঁর জোরালো শট ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়৷ মুহূর্তেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয় ডিআর কঙ্গো৷

অপ্রত্যাশিত এই ধাক্কায় কিছুটা ছন্দ হারিয়ে ফেলে ইংল্যান্ড৷ মাঝমাঠে ডেকলান রাইস ও জুড বেলিংহ্যাম বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও আক্রমণের শেষভাগে ছিল চরম অস্থিরতা৷ অন্যদিকে কঙ্গোর রক্ষণ ছিল সুশৃঙ্খল, আর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি যেন পোস্টের নিচে একাই গড়ে তুলেছিলেন এক অদৃশ্য প্রাচীর৷ ৩০তম মিনিটে রাইসের ক্রস থেকে বেলিংহ্যামের শক্তিশালী হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন এমপাসি৷ পাঁচ মিনিট পর রাশফোর্ডের নিচু ক্রস থেকে গোলপোস্টের সামনে হ্যারি কেইন ও বেলিংহ্যাম ওত পেতে থাকলেও শেষ মুহূর্তে গোললাইন থেকে বল ক্লিয়ার করে কঙ্গোর লিড অক্ষুণ্ণ রাখেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা৷ প্রথমার্ধের শেষদিকে ৪৩ মিনিটে বক্সের ভেতরে গোলরক্ষকের সংস্পর্শে কেইন পড়ে গেলে পেনাল্টির জোর দাবি তোলে ইংল্যান্ড, তবে রেফারি সেটিকে ডাইভ হিসেবে দেখে ভিএআর (VAR) এর সহায়তায় মাঠের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে বিতর্ক ছড়ায়৷

টুখেলের মাস্টারস্ট্রোক ও কেইনের ম্যাজিক: ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে বিরতির পর দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে৷ টুখেলের কড়া নির্দেশনায় ইংল্যান্ড আক্রমণের গতি বাড়ালেও কঙ্গোর রক্ষণ সামাল দিচ্ছিল৷ ম্যাচের এক ঘণ্টা পার হতেই আক্রমণে নতুন প্রাণ ফেরাতে একসঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পরিবর্তন আনেন কোচ টুখেল৷ নোনি মাদুয়েকে ও রাশফোর্ডের পরিবর্তে মাঠে নামেন বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডন৷ কিছুক্ষণ পর যোগ দেন এবেরেচি এজেও৷ এই বদলগুলোই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়৷

অবশেষে ৭৪তম মিনিটে আসে ইংল্যান্ডের বহু প্রতীক্ষিত সেই সমতা৷ ডেকলান রাইস ডান প্রান্তে দারুণ একটি বল বাড়িয়ে দেন গর্ডনের দিকে৷ গর্ডনের নিখুঁত ক্রস বক্সে উড়ে আসতেই অসাধারণ হেডে জাল কাঁপান অধিনায়ক হ্যারি কেইন (১-১)৷ সমতায় ফেরার পর আর থামেনি ইংল্যান্ড৷ ৮৬তম মিনিটে বেলিংহ্যামের শট প্রথমে এমপাসি ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বল বক্সের বাইরে পেয়ে ডান দিকে এক পা সরিয়ে অসাধারণ কোনাকুনি শটে বল জালের ওপরের কোণায় জড়িয়ে দেন হ্যারি কেইন৷ তাঁর এই জাদুকরী গোল পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দিয়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেয়৷ শেষ মুহূর্তে উইসার ফ্রি-কিক ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে থ্রি লায়ন্স শিবির৷ রুদ্ধশ্বাস এই প্রত্যাবর্তনের জয়ে ইংল্যান্ড এখন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ সহ-আয়োজক মেক্সিকো৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *