বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর নতুন করে ‘সেবা ফি’ বা ট্রানজিট ফি আরোপ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান৷ তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ও সাম্প্রতিক কঠিন সময়ে যেসব বন্ধু রাষ্ট্র কৌশলগতভাবে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছিল, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিশেষ ছাড় ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা রাখা হবে৷ চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘ওয়ার্ল্ড পিস ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্দোলরেজা রহমানি ফাজলি এই বড় সিদ্ধান্তের কথা জানান৷
এর আগে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য হওয়া প্রাথমিক চুক্তিতে বা সমঝোতায় বলা হয়েছিল— যুদ্ধবিরতির ৬০ দিন পর্যন্ত সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো অতিরিক্ত ফি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে৷ তবে এই ৬০ দিনের সময়সীমা পার হওয়ার পর কী নিয়ম কার্যকর হবে, তা নিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য মহলে ধোঁয়াশা ছিল৷ ইরানি রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের মাধ্যমে তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট হলো৷
টোল নয়, নেওয়া হবে ‘সেবা ফি’: রাষ্ট্রদূত আব্দোলরেজা রহমানি ফাজলি বেইজিংয়ের ফোরামে বলেন— হরমুজ প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তা ও রানিং শৃঙ্খলা জোরদার করতে ইরান প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিচালনা ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু করেছে৷
তিনি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনে ব্যাখ্যা করেন— “হরমুজ প্রণালির একটি বড় অংশ যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার (Territorial Waters) মধ্যে পড়ে, তাই আমরা অবশ্যই জলসীমায় প্রদত্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সেবা বাবদ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি নেব৷ তবে এটিকে সরাসরি ‘টোল’ বলা যাবে না৷”
রাষ্ট্রদূত আরও জানান— হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অত্যাধুনিক রাডারের মাধ্যমে জাহাজগুলোর রানিং চলাচল নিখুঁতভাবে তদারকি করা এবং প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক তেল ট্যাংকার চলাচলের কারণে প্রণালির সামুদ্রিক পরিবেশের যে মারাত্মক ক্ষতি হয়, তা দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করার জন্য এই বিশেষ ফান্ড বা ফি নেওয়া হবে৷ এই নতুন কর কাঠামো থেকে অর্জিত অর্থ পরিবেশ সুরক্ষা ও নৌপথের আধুনিকায়নে ব্যয় হবে৷
বন্ধু দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা ও ভূ-রাজনীতি: বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশে ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন— “যেসব পরাশক্তি বা দেশ আমাদের প্রকৃত বন্ধু ছিল এবং সাম্প্রতিক কঠিন ও যুদ্ধকালীন সময়ে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আমাদের পাশে সোচ্ছ্বাসে দাঁড়িয়েছে, তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই ট্রানজিট ফি-র ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষ ছাড় ও বড় ধরণের সুবিধা রাখা হবে৷” বিশ্লেষকদের মতে— ইরানের এই ইঙ্গিত মূলত চীন, রাশিয়া ও তাদের সহযোগী এশীয় বাণিজ্য অংশীদারদের উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছে৷
উল্লেখ্য— ওমান ও ইরানকে বিভক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত৷ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ জোগান কেবল এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই বাহিত হয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়৷ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইরান প্রায় এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এবং সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রানিং গতিতে হু হু করে রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল৷ ইরানের এই নতুন ফি আদায়ের সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক পণ্য ও তেল পরিবহন খরচ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদেরা৷
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
