নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত ও বহুল আলোচিত সাত খুনের নৃশংস ঘটনার দীর্ঘ ১২ বছর পার হয়ে গেছে৷ কিন্তু দেশের বিচারিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এই মামলার রায় এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি৷ দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, উচ্চ আদালতে একের পর এক আপিল এবং আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে মামলাটি এখনো আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে৷ ফলে বছরের পর বছর ধরে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন নিহতদের অসহায় পরিবারের সদস্যরা৷ রায় হওয়ার পরও বিচার কবে শেষ হবে— এই একটি মাত্র প্রশ্ন এখন তাড়া করে ফিরছে শীতলক্ষ্যার তীরে স্বজন হারানো মানুষদের৷
শীতলক্ষ্যার বুকে সেই কৃষ্ণতম অধ্যায়: ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মুখে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়৷ ঘটনার তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পেট চেরা ও বস্তাবন্দী অবস্থায় একে একে উদ্ধার করা হয় তাঁদের বিকৃত লাশ৷ ময়নাতদন্তে উঠে আসে পৈশাচিক নির্যাতনের চিত্র— নিহতদের মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল, গলার ভেতর ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল এবং লাশগুলো যাতে কখনোই ভেসে না ওঠে, সেই জন্য নদীতে ডুবিয়ে রাখার বিশেষ কৌশল ও ইট বেঁধে দেওয়া হয়েছিল৷ ঘটনাটি সে সময় পুরো দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং তৎকালীন এলিট ফোর্স র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বৈশ্বিক মানবাধিকার মহলেও বড় প্রশ্ন উঠেছিল৷
সেদিন দুপুরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগী৷ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় পৌঁছালে র্যাবের একটি দল সাদা পোশাকে তাঁদের গাড়ির গতি রোধ করে তুলে নিয়ে যায়৷ একই সময়ে ঘটনাটি পিছন থেকে প্রত্যক্ষ করেন নারায়ণগঞ্জের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার৷ তিনি নিজের মোবাইল দিয়ে এই অপহরণের ভিডিও করার চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা তাকে ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও পথ থেকে তুলে নিয়ে যায়৷
আদালতের রায় ও সাজাপ্রাপ্তদের রানিং তালিকা: মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালে ৩৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ৷ পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন৷ রায়ে র্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম মাসুদ রানাসহ মূল পরিকল্পনাকারী নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়৷ পরে উচ্চ আদালত বা হাইকোর্টে আপিল হলে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং অন্যদের সাজা বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করা হয়৷ বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের লিভ টু আপিল পর্যায়ে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে৷
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামিরা হলেন— নূর হোসেন, তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানা, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, এবি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন এবং সৈনিক তাজুল ইসলাম৷ এছাড়া মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট এনামুল কবির এবং নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদসহ আরও কয়েকজন৷
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও স্বজনদের রানিং আকুতি: নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন— মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে আপিল পর্যায়ে বিচারাধীন থাকায় সময় লাগছে৷ তবে নতুন সরকার ও বিচার বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে তাঁরা অত্যন্ত আশাবাদী৷
নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে সাংবাদিকদের বলেন— “আমরা দীর্ঘ ১২ বছর ধরে শুধু একটা ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধে আছি৷ আদালতের রায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু খুনিদের ফাঁসি কার্যকর চোখের সামনে এখনো দেখলাম না৷ সে সময় বেগম খালেদা জিয়া আমাদের বাসায় এসে বিচার নিশ্চিতের শতভাগ আশ্বাস দিয়েছিলেন৷ আজ তাঁর দল ক্ষমতায় এবং তাঁর সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী৷ আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাই— আমাদের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এই খুনিদের ফাঁসি যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়৷”
সাত খুন মামলার অন্যতম প্রধান আইনজীবী, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও বর্তমান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এ বিষয়ে বলেন— “মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে রয়েছে৷ আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আশা করছি দ্রুত এটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসবে৷ সাত খুনের শিকার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে৷ রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত এই আইনি জট খুলে রায় কার্যকর করে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো৷”
