ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা কালবৈশাখী— যেকোনো বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা পেতে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও মূল ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা আবহাওয়া অধিদপ্তর৷ দেশের আনাচে-কানাচে আবহাওয়ার নিখুঁত ও তাৎক্ষণিক লাইভ তথ্য দিতে সংস্থাটি পাঁচটি অত্যাধুনিক ডপলার রাডারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল৷ তবে চরম উদ্বেগজনক বিষয় হলো— ভরা বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের এই সুনির্দিষ্ট মৌসুমে ওই পাঁচটির সবকটি রাডারই এখন কারিগরি ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে৷
এমন মারাত্মক পরিস্থিতিতে নিজেদের রাডার নেটওয়ার্ক ছাড়াই অন্য সংস্থার কাছ থেকে সম্পূর্ণ ধার করা তথ্যের ভিত্তিতে দৈনিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরি করছে আবহাওয়া অধিদপ্তর৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন— রাডার নষ্ট থাকায় এই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে দেশের আগাম ও নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াটি এখন বড় ধরনের জাতীয় ঝুঁকিতে পড়েছে৷
কোথায় কী অবস্থায় রয়েছে রাডারগুলো? বর্তমানে ঢাকা, কক্সবাজার, পটুয়াখালীর খেপুপাড়া, রংপুর ও মৌলভীবাজারে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ডপলার রাডার স্টেশন রয়েছে৷ এর মধ্যে কারিগরি ত্রুটি, মূল যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অকেজো৷ আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এসব রাডারের লিংকে ক্লিক করলে কেবল ‘আন্ডার মেইনটেন্যান্স (রক্ষণাবেক্ষণাধীন)’ লেখা রানিং বার্তা দেখানো হয়৷
বাকি দুটি রাডার সচল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে বিদ্যুৎ ও টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে সেগুলোও বন্ধ রয়েছে৷ যার মধ্যে রংপুরের রাডারটি অটোমেটিক ভোল্টেজ রেগুলেটর (এভিআর) সমস্যার কারণে চলতি বছরের ১৭ জুন থেকে অচল৷ আর ঢাকার প্রধান রাডারটি হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগের সমস্যার কারণে গতকাল শনিবার (৪ জুলাই) থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে৷
বিশেষজ্ঞদের বিস্ফোরক মন্তব্য ও ক্ষোভ: সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক পলিউশন স্টাডিজের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট জলবায়ু গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এই চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন৷ তিনি বলেন— “তিনটি রাডার পুরোপুরি অচল থাকায় উপকূলের মানুষ আবহাওয়ার সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন৷ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ রাডার রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে চরম অনীহা ছিল৷ এর পেছনে অনেক দুর্নীতি ও হরিলুটও ছিল৷ নষ্ট রাডারগুলো দ্রুত মেরামত করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ৷”
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন— “একটি রাডারের কার্যক্ষমতার সীমা থাকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত৷ রাডার সচল থাকলে অন্তত এক দিন আগেই জানা সম্ভব ঝড়টি কত কিলোমিটার বেগে কোন দিক থেকে ধেয়ে আসছে৷ বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হয়েছে এবং দেশের উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টিপাত হচ্ছে৷ কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলের সবগুলো রাডার অচল থাকায় লঘুচাপটি সুনির্দিষ্টভাবে কোন দিক থেকে কোন দিকে যাচ্ছে তা রানিং পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না৷ ফলে দেশের মানুষ এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত৷” স্যাটেলাইটের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি জানান— স্যাটেলাইট ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে থাকায় তা মেঘের আনাগোনা দেখালেও কতটুকু বৃষ্টি হবে তা শতভাগ নিখুঁতভাবে বলতে পারে না, যা কেবল রাডারই পারে৷
আবহাওয়া অধিদপ্তরের রানিং বক্তব্য ও বিকল্প পথ: এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তারিফুল কবির নেওয়াজ জানান— কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার কারিগরি ত্রুটির কারণে অচল৷ রংপুরের রাডারটি ওয়ারেন্টির আওতায় থাকায় জাপানি প্রস্তুতকারক কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা এটি মেরামত করতে ইতিমধ্যেই ঢাকার পথে আছেন বা চলে এসেছেন৷ আর ঢাকার রাডারটি প্রকৌশলীরা দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করছেন৷ তিনি স্বীকার করেন— আপাতত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর রাডারের সাহায্য নিয়ে আবহাওয়ার নিয়মিত প্রতিবেদন ও পূর্বাভাস তৈরি করা হচ্ছে৷
ধেয়ে আসছে ৯ দিনের শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’: দুর্যোগের এই ক্রান্তিকালে রাডার বিকল থাকার মাঝেই দেশের দিকে ধেয়ে এসেছে চলতি মৌসুমের দ্বিতীয় শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ মৌসুমি বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’৷ আজ রোববার (৫ জুলাই) থেকে আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এই বৃষ্টিবলয়ের প্রভাবে সারা দেশেই ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে দেশের প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ এলাকা বৃষ্টির আওতায় আসবে বলে জানিয়েছে বেসরকারি আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা ‘বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারবেশন টিম’ (বিডব্লিউওটি)৷ আগামী ৭ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত এই বৃষ্টিবলয়টি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে৷
পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার রেড অ্যালার্ট: বিডব্লিউওটি-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী— এই বৃষ্টিবলয় চলাকালীন সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটানা নিয়মিত ভারী বৃষ্টি হবে এবং এসব অঞ্চলে রোদের দেখা মেলা ভার হবে৷ অতি ভারী বর্ষণের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের যথেষ্ট রানিং ঝুঁকি রয়েছে৷ পাশাপাশি ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে ভারী বৃষ্টির ফলে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্ত এলাকায় সাময়িক আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে৷ একটানা বৃষ্টির কারণে সিলেট, ময়মনসিংহ এবং পার্বত্য বান্দরবানসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিছু এলাকাগুলো সাময়িকভাবে জলমগ্ন বা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে৷
