সম্প্রতি জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে দেশজুড়ে গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র অসন্তোষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা এবং তথাকথিত ‘ভূতুড়ে বিলের’ অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপাক্ষিক ব্যাখ্যা দিয়েছে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ৷ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন— জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অধিকাংশ অভিযোগই মূলত ভুল–বোঝাবুঝির কারণে তৈরি হয়েছে এবং অলরেডি মাঠপর্যায়ে সেগুলো যাচাই করে দ্রুত সমাধান করা হয়েছে৷ আজ সোমবার বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন৷
যেসব কারণে জুন মাসে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক বেড়েছে: সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগের লিখিত বক্তব্য ও রানিং পর্যালোচনা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ৷ তিনি বলেন— যেসব বিদ্যুৎ বিলকে সাধারণ গ্রাহকরা ‘ভূতুড়ে বিল’ বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো তা সরজমিনে নিখুঁতভাবে যাচাই করেছে৷ অনেক বিলে কোনো ধরনের যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি পাওয়া যায়নি৷ মূলত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া এবং ট্যারিফ বা দাম বাড়ার কারণেই এবার গ্রাহকদের বিল বেশি এসেছে৷ তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু স্বাভাবিক করণিক ভুল পাওয়া গেছে, সেগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত সংশোধন ও যথাযথ আইনি প্রতিকার দেওয়া হচ্ছে৷
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান— জুন মাসের বিল বৃদ্ধি শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরমের কারণে ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর স্ল্যাবে (উচ্চ ইউনিট হার) বিল গণনা করায় মোট বিল তুলনামূলক অনেক বেশি দেখাচ্ছে৷ সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত, ঈদুল আজহার ছুটি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা দাবদাহ, চলমান আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এসএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষার কারণে সারাদেশে বিদ্যুতের জাতীয় চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে৷ একই সময়ে বাসাবাড়িতে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), ইলেকট্রিক ফ্যান, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক লাক্সারি যন্ত্রের ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে৷ এমনকি দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা সামগ্রিক বিদ্যুৎ বিল বাড়াতে বড় প্রভাব ফেলছে৷
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন— ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে সারা রাত দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তি থাকছে৷ এ কারণে জরুরি ও পিক আওয়ারের প্রয়োজনে ব্যবহৃত পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রাতে বেশি চালাতে হচ্ছে এবং দিনে বিশ্রাম দিতে হচ্ছে৷ এতে করেও সাময়িকভাবে কিছুটা বিদ্যুৎ–ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তবে এই সংকট শিগগিরই পুরোপুরি কেটে যাবে৷ জুনের এই বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের টাকা পিডিবি মূলত আগস্ট মাস থেকে পেতে শুরু করবে৷
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের রানিং বৈষম্য ও পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদের ভুল নীতি: দেশজুড়ে প্রত্যন্ত গ্রামে এবং মফস্বল এলাকায় তুলনামূলক অনেক বেশি লোডশেডিং হওয়া নিয়ে সাংবাদিকদের এক কড়া প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত অকপটে বলেন— “স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও আমরা প্রকৃত প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারিনি৷ বিভিন্ন জাতীয় ও কৌশলগত কারণেই দেশের রাজধানী ঢাকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি৷ তাই নানা বাস্তব কারণে লোডশেডিংয়ের এই আঞ্চলিক বৈষম্য রাতারাতি দূর করা যাচ্ছে না৷ তবে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার কোনো ধরনের বৈষম্য বা আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব চায় না এবং এই বৈষম্য দ্রুত দূর করার আন্তরিক প্রচেষ্টা রানিং চালাচ্ছে৷”
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন— বর্তমান বিদ্যুৎ খাত যে তীব্র ঋণ ও অব্যবস্থাপনার সমস্যায় জর্জরিত, তা মূলত বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে হয়েছে৷ এই বিশাল পর্বতসম সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান অন্তর্বর্তী ও নতুন সরকার পেয়েছে৷ বিএনপি সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হতে চায়, পরনির্ভরশীল নয়৷ এই লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রিন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে (রিনিউয়েবল এনার্জি) সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে৷ সরকারের বর্তমান সাংবিধানিক মেয়াদ শেষে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে দেশের গ্রিডে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন নিশ্চিত হবে৷
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেসরকারি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ চুক্তি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন— এ বছর দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ জাতীয় চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট৷ এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ (১৮০০ মেগাওয়াট) রিজার্ভ ক্যাপাসিটি বা আপদকালীন সক্ষমতা থাকতে পারে৷ অথচ বিগত সরকার প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত সক্ষমতা বসিয়ে রেখেছে৷ বছরের পর বছর ধরে এসব অতিরিক্ত অলস সক্ষমতা বসিয়ে রেখে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হচ্ছে৷ এর ফলে সরকারি ভর্তুকি বাড়ছে এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর চরম চাপ তৈরি করছে৷ রাষ্ট্রের স্বার্থ নিশ্চিত না করেই বিভিন্ন দলীয় বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) করা হয়েছিল৷ বর্তমান সরকার এখন সেই সমস্ত চুক্তি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে৷ তবে এগুলো আন্তর্জাতিক ও সার্বভৌম চুক্তি হওয়ায় চাইলেই হুট করে একতরফা বাতিল করা যায় না, তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে ট্যারিফ বা ভাড়ার হার কমানোর বিষয়ে রানিং আলোচনা চলছে৷
স্মার্ট মিটারের ভাড়ার আসল হিসাব: সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে গ্রাহকদের মিটারের ভাড়া সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করে বলা হয়— দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা গ্রাহকদের এককালীন মূল্য পরিশোধ সাপেক্ষে অথবা সহজ কিস্তিতে মিটার সরবরাহ করে থাকে৷ যেসব গ্রাহক সংযোগ নেওয়ার সময় মিটারের এককালীন সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করেন, তাঁদের কাছ থেকে মাসিক বিলে কোনো নতুন কিস্তি বা ভাড়া নেওয়া হয় না৷ শুধু যেসব গ্রাহক এককালীন টাকা না দিয়ে কিস্তিতে মিটার সংযোগ গ্রহণ করেন, তাঁরাই মাসিক কিস্তি পরিশোধ করছেন৷ এ ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ ডিজিটাল মিটারের কিস্তি প্রতি মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের কিস্তি প্রতি মাসে ২৫০ টাকা ধার্য রয়েছে, যা কোনো অতিরিক্ত ভাড়া নয়৷
