ইরাক-ইরানে ৬ দিনের শোকযাত্রা শেষে আজ সম্পন্ন হচ্ছে দাফন

ইরানের দীর্ঘকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন ইরাকের পবিত্র ধর্মীয় নগরী নাজাফ থেকে বিমানযোগে ইরানের মাশহাদ নগরীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) মাশহাদ শহরেই তাঁর দাফন কাজ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘মেহর নিউজ এজেন্সি’৷ ইরান ও ইরাক— দুই দেশজুড়ে টানা ছয় দিনব্যাপী চলা নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে খামেনির কফিন আজ এই স্থানান্তর করা হচ্ছে৷ এর আগে ইরাকের নাজাফ ও পবিত্র কারবালাসহ দুই দেশের প্রধান প্রধান বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়৷

ইমাম রেজার মাজারের পাশে দাফন ও শেষ ইচ্ছা: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহচর ও তাঁর কার্যালয়ের প্রধান মোহাম্মদ মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান— জীবদ্দশায় খামেনি নিজে একটি অসিয়ত বা ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে ইরানের মাশহাদ শহরে অবস্থিত অষ্টম শিয়া ইমাম হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার শরীফের কাছাকাছি কোনো স্থানে দাফন করা হয়৷ সর্বোচ্চ নেতার সেই শেষ ইচ্ছা ও অসিয়ত অনুযায়ীই আজ মাশহাদে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে তাঁর দাফন সম্পন্ন করার রানিং প্রস্তুতি শেষ করেছে ইরান সরকার৷

বিগত শুক্রবার থেকে আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ বিদায়ের এই রাজকীয় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়৷ শুরুর দিকে খামেনি, তাঁর এক কন্যাসন্তান ও তাঁর ১৪ মাস বয়সী এক নাতি, তাঁর এক জামাতা এবং তাঁর প্রভাবশালী পুত্র মোজতবার স্ত্রীর কফিন ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিদেশি বিশিষ্ট রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনীতিকদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল৷ গত সোমবারের তেহরানের বিশাল ও ঐতিহাসিক শোকযাত্রার আগে শনি ও রোববারও দেশটিতে বড় আকারের শোক মিছিল ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়৷ এরপর কফিন ইরাকে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পবিত্র নগরীগুলোর রাজপথে সাধারণ জনতার নজিরবিহীন ঢল নেমে আসে৷

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফ্ল্যাশব্যাক: উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে চালানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক আকস্মিক ও শক্তিশালী যৌথ বিমান হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিহত হন৷ খামেনির মৃত্যুর ওই দিনই ইরান তীব্র প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে শত শত ব্যালাস্টিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে পাল্টা রানিং হামলা চালালে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক প্রলয়ঙ্কারী ও বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে যায়৷ এই দীর্ঘ ও বিধ্বংসী যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মূল ইসলামিক শাসন কাঠামো অক্ষত ও টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয় তেহরান৷

গত জুন মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি প্রাথমিক ও ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে৷ তবে এই যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র (Strait of Hormuz) মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল সরবরাহের ওপর সম্পূর্ণ একক সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের কৌশলগত চূড়ান্ত বিজয় দাবি করেছে ইরান৷ সর্বোচ্চ নেতার এই দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আজ ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা রানিং রাখা হয়েছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *