৫ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি, পাহাড়ধসে ২২ জনের প্রাণহানি

টানা পাঁচ দিনের অবিরাম মুষলধারে বৃষ্টিপাত ও ওপর থেকে নেমে আসা ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পর্যটন জেলা কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির এক চরম ও আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটেছে৷ জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন৷ কয়েক দিনের টানা জলতাণ্ডব ও পাহাড়ধসের সুনির্দিষ্ট ঘটনায় গত চার দিনে জেলাজুড়ে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২২ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে৷ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন ও আবহাওয়া কার্যালয়ের জরুরি বুলেটিনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে৷

পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু ও চকরিয়ার ট্র্যাজেডি: টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গত চার দিনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে সর্বোচ্চ ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে মারা গেছেন৷

সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা ডবলতলী এলাকায় এক ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে৷ ঘরের ওপর পাহাড়ের বিশাল মাটির স্তূপ ভেঙে পড়ায় ঘুমন্ত অবস্থায় চাপা পড়ে দুই শিশু ঘটনাস্থলেই নিহত হয়৷ নিহতরা হলো ওবায়দুল ইসলাম (১৩) ও রুমী আক্তার (১৩)৷ এ ঘটনায় একই পরিবারের আরও একজন গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন৷ চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান জানান— টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি রানিং রয়েছে, তাই পাহাড়ের পাদদেশে বা সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে৷

৩৫ ইউনিয়ন প্লাবিত ও দুই নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে: জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের রানিং তথ্য অনুযায়ী— কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে৷ বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে৷ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়ন৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ— কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে এবং প্রশাসন থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ রানিং বাড়ছে৷ পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান— অতিরিক্ত বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে৷

এদিকে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান— আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার সর্বশেষ পরিমাপ অনুযায়ী বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা উভয় নদীরই বিপদসীমার চেয়ে অনেক বেশি৷ চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নে নদীর বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে প্রবল বেগে পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকছে৷

৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি ও ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত: কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান— গত পাঁচ দিনে জেলায় মোট ৫৪৭ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে৷ মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত জেলাজুড়ে এই অতি ভারী বৃষ্টিপাত রানিং অব্যাহত থাকতে পারে৷

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো৷ আ৷ মান্নান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা ও জানমালের সুরক্ষার বিষয়ে বলেন— “ইতিমধ্যে দুর্গত মানুষের জন্য জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে৷ উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি লজিস্টিক সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে৷”

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকার কারণে এবং স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল থাকায় টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে৷ এতে দ্বীপ অঞ্চলগুলোর হাজার হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম খাদ্য ও যোগাযোগ সংকটে পড়েছেন৷ একই সঙ্গে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও দুই শতাধিক স্পটে ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *