ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকাজুড়ে আন্তর্জাতিক ও মধ্যস্থতাকারীদের চাপানো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি বলবৎ থাকার পরও তা তোয়াক্কা না করে আবারও নতুন করে প্রাণঘাতী ড্রোন ও ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)৷ সর্বশেষ চালানো এই আকস্মিক হামলায় চিকিৎসাকর্মীসহ অন্তত পাঁচজন ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন৷ গতকাল শুক্রবার উত্তর গাজার ঐতিহ্যবাহী কামাল আদওয়ান হাসপাতালের ভেতরে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে সরাসরি বিস্ফোরক বা গ্রেনেড ফেলার পর এই হতাহতের ঘটনা ঘটে৷ গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম আজ শনিবার (১১ জুলাই) এই ভয়াবহ হামলার রানিং পরিস্থিতি নিশ্চিত করেছে৷

হাসপাতালে ড্রোন হামলা ও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র: স্থানীয় উদ্ধারকারী ও চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে— গতকাল শুক্রবার একটি সশস্ত্র ইসরায়েলি কোয়াডকপ্টার ড্রোন কামাল আদওয়ান হাসপাতালের নির্ধারিত ও রেড ক্রসের চিহ্নিত নিরাপদ চত্বরের ভেতরে আচমকা বিস্ফোরক ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায়৷ এই নজিরবিহীন হামলায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রানিং ডিউটিতে থাকা দুইজন সিনিয়র হাসপাতালকর্মী ও নার্স স্প্লিন্টারের আঘাতে মারাত্মক রক্তাক্ত ও আহত হন৷

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস এই ধ্বংসযজ্ঞের পর এক লোমহর্ষক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে জানিয়েছে— ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজা উপত্যকার মোট ৩৮টি লাইভ হাসপাতালের মধ্যে ৩৪টি হাসপাতালই ইসরায়েলি বিমান হামলায় সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ ও ধ্বংস হয়ে গেছে৷ বর্তমানে সমগ্র গাজাবাসীর জন্য মাত্র চারটি হাসপাতাল অত্যন্ত সীমিত লজিস্টিক ও জরুরি চিকিৎসা সক্ষমতা নিয়ে কোনোমতে চিকিৎসাসেবা রানিং রেখেছে৷ কামাল আদওয়ান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই বর্বরোচিত ঘটনার পর অবিলম্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার অবশিষ্টাংশের চিকিৎসা অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ (UN) এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর জরুরি ও সরাসরি সামরিক-কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের জোর আহ্বান জানিয়েছে৷

যুদ্ধবিরতির পর ১ হাজার ফিলিস্তিনি খুন ও হতাহতের সর্বশেষ আপডেট: গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রানিং ডাটাবেজের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী— গত ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর গাজায় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি বিশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বাহিনীর চোরাগোপ্তা ও আকস্মিক হামলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪ জন নিরপরাধ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ৫০৭ জন মারাত্মক আহত হয়েছেন৷ আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ও অসম এই যুদ্ধে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ১২০ জনে এবং আহতের মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ জনে, যাদের সিংহভাগই অবুঝ শিশু ও নিরীহ নারী৷

এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে উল্টো দাবি করেছে— গত ৮ ও ৯ জুলাই উত্তর গাজায় পৃথক দুটি সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়ে স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের দুই সক্রিয় সদস্যকে সফলভাবে হত্যা করা হয়েছে৷ তেল আবিবের দাবি— তাদের একজন হামাসের সামরিক উৎপাদন ইউনিটের শীর্ষ কমান্ডার এবং অন্যজন নুসেইরাত ব্যাটালিয়নের একজন দক্ষ প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন৷ তবে স্বাধীন কোনো পক্ষ থেকে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি৷ একই দিনে ইসরায়েলি বাহিনী আল-বুরেইজ, খান ইউনিস, গাজা সিটি ও দক্ষিণ সীমান্তের রাফাহ এলাকাতেও নতুন করে ভারী গোলাবর্ষণ করেছে৷ অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও গভীর রাতে ব্যাপক অভিযান ও গণগ্রেপ্তার চালিয়েছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী৷ ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে— আল-খলিলের দক্ষিণে আসফি এলাকায় উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারী ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি কৃষক আহত হয়েছেন, সেখানেও পরিস্থিতি রানিং থমথমে রয়েছে৷

সূত্র: শাফাক নিউজ

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *