২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে প্রথমবার স্বদেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে (Reuters) দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন— আগামী ডিসেম্বর (২০২৬) মাসের মধ্যেই তিনি ভারতের দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফিরে সরাসরি আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছেন৷
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই চাঞ্চল্যকর ও নাটকীয় ঘোষণার পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রথমবার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে৷ বুধবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট করে বলেছেন— ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশের বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি৷ যেকোনো ধরনের প্রত্যর্পণ (Extradition) সম্পূর্ণ একটি আইনি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত বিষয় এবং এটি দ্বিপাক্ষিক আইন ও চুক্তি অনুযায়ীই নিষ্পত্তি করা হবে৷’
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যা বললেন শেখ হাসিনা: দিল্লির একটি গোপন নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার বিশেষ সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে ফেরার ঘোষণা দিয়ে বলেন— ‘আমাকে দেশে ফিরতেই হবে৷ আমার দলের লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা ভয়াবহ দমন-পীড়ন ও চরম নিগ্রহের শিকার হয়ে আত্মগোপনে আছেন৷ যদি মৃত্যু আসে, আমি চাই আমার নিজের দেশের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছে৷’
নিজের অপরাধের দায় অস্বীকার করে এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আদালতে হওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন— ‘দেশে ফিরলে তাঁরা আমাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি কারাগারে নিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে আমাকে মেরেও ফেলতে পারে৷ তবুও আমি ফিরে যাব৷ আমি বিচারের মুখোমুখি হতে ভয় পাই না৷ আমি দেশের বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে জনগণকে দেখাতে চাই আমাদের বিরুদ্ধে কতটা প্রহসনের বিচার চলছে৷’
তিনি আরও প্রকাশ করেন যে— তিনি ইতিমধ্যেই ভারতের আশ্রয়ে থাকা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনা করেছেন৷ তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেছেন— ‘এবার আমি নিজে প্রথমে বাংলাদেশে ফিরছি৷ এরপর তোমরাও সবাই একে একে ফিরে এসো৷ আমরা সবাই দলগতভাবে একযোগে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করব৷’
প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ স্নায়ুযুদ্ধ: উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় সংগঠিত গণহত্যার দায়ে বাংলাদেশের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে ‘মৃত্যুদণ্ডাদেশ’ প্রদান করেছে৷ ঢাকা থেকে নয়াদিল্লির কাছে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে একাধিক চিঠিও পাঠানো হয়েছে৷
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন— শেখ হাসিনার আকস্মিক ও স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের এই ঘোষণা ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে৷ আগামী ডিসেম্বর মাসে তাঁর এই কথিত প্রত্যাবর্তন কীভাবে সম্পন্ন হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা ভারতের প্রশাসন এটিকে কীভাবে সামাল দেবে, তা নিয়ে এখন গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল কৌতূহল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে৷
