গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ শোক ও আলোচনা সভায় কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফখরুল ইসলাম মিঠু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সময় সরাসরি পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ্য করে বলেন— ‘আপনি কুমিল্লায় দায়িত্ব নিয়ে আসার পরে ফ্যাসিস্টরা বুক ফুলিয়ে কুমিল্লায় চলে এসেছে৷ আপনি তথ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করছেন না বা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না৷’
ছাত্রদল নেতার এমন প্রকাশ্য ও সরাসরি গুরুতর অভিযোগের জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে মাইক নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এসপি মো. আনিসুজ্জামান৷ তিনি বলেন— ‘যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার পরিবর্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত৷ আপনি এভাবে ঢালাওভাবে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর প্রধানের সামনে কথা বলতে পারেন না৷ এটা কোনো রাজনৈতিক দলীয় মঞ্চ নয়; কথা বললে সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে বলবেন৷’
নিজের ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন— ‘ছাত্রদল আমি নিজেও করেছি৷ আপনার বহু আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ছাত্রদল করে এসেছি৷ সুতরাং আমাকে রাজনীতি শেখাতে আসবেন না৷’
পুলিশের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে আইন নিজের হাতে নেওয়ার মতো অভিযোগ না তোলার কঠোর আহ্বান জানিয়ে এসপি বলেন— ‘আজকাল একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে যে, যাকে আপনাদের ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ হয় না, তাকেই আপনারা ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন! মামলায় পুলিশ কাকে গ্রেপ্তার করবে আর কাকে ছাড়বে, সেটা সম্পূর্ণ দেশের প্রচলিত আইন ও তদন্ত অনুযায়ী নির্ধারণ হবে৷ থানার ওসি কাকে গ্রেপ্তার করবে, সেটার অযাচিত নির্দেশ বা রাজনৈতিক চাপ আপনারা দিতে পারেন না৷’
তিনি ক্ষোভের সাথে আরও বলেন— ‘কথা বলার আগে একটু চিন্তা-ভাবনা করবেন৷ একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার আগে মাঠের বাস্তবতা জানা দরকার৷ ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যখন দেশের কোথাও কোনো পুলিশ ছিল না৷ সেই নড়বড়ে ও ধ্বংসাত্মক অবস্থা থেকে পুলিশ বাহিনী আবার নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷’
প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের সমালোচনা করে পুলিশ সুপার বলেন— ‘গত ১৭ বছরে দেশের বিভিন্ন স্বাধীন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে৷ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে৷ একটি নতুন সংস্কারমুখী সরকারের বয়স মাত্র চার মাস৷ চার মাসের মাথায় তাদের জাদুকরী সব কাজের মূল্যায়ন করা অন্যায়, তাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে৷’
সভায় উপস্থিত অন্যান্য সুধীজনদের বিচারহীনতার অভিযোগের জবাবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন— ‘দেশে বিচার হয় না এ কথা মোটেই ঠিক নয়৷ বিভিন্ন আলোচিত মামলায় বিজ্ঞ বিচারক রায় দিয়েছেন, অনেকের ফাঁসির আদেশ হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিচার প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে৷ আমি নিজে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেককে গ্রেপ্তার করেছি এবং দ্রুত চার্জশিট দিয়েছি৷’ এসপির এই কড়া ও যৌক্তিক বক্তব্যের পর সভাকক্ষে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মাঝে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে৷
