ঐতিহাসিক চব্বিশের ২৩ জুলাই: শিক্ষার্থীদের ৪ দফার ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে মেসে হানা দিয়ে হাজারো ছাত্র গ্রেপ্তার

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের আজ সেই রক্তঝরা ও বিভীষিকাময় ২৩ জুলাই৷ চব্বিশের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা তাদের চার দফা ‘জরুরি দাবি’ মেনে নিতে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি ৪৮ ঘণ্টার কড়া আলটিমেটাম দিয়েছিল৷ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম এই সময়সীমার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন৷

সমন্বয়কদের ৪ জরুরি দাবি ও নিখোঁজ সংবাদ: সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রনেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— এই চার দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা বা সংলাপে তারা বসবেন না৷ শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে চার দফা দাবি উত্থাপন করে জানান— দ্রুততম সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি সচল করা, সারা দেশে জারি করা কারফিউ প্রত্যাহার করা, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে নিয়ে আবাসিক হল খুলে দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে৷

একই সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানানো হয়— আন্দোলনের তিন শীর্ষ সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ ১৮ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছেন৷ আসিফ মাহমুদের বাবা সন্তানকে না পেয়ে মর্গে মর্গে ঘুরেও হদিস পাননি, যা আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলে দেয়৷

মেসে হানা, গণগ্রেপ্তার ও সিএমএম কোর্টে আহাজারি: আলটিমেটামের দিন গভীর রাতে পুলিশ রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বাসা, মেস ও ফ্ল্যাট ঘেরাও করে নজিরবিহীন ‘চিরুনি অভিযান’ চালায়৷ মাত্র ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে প্রায় এক হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে কেবল ঢাকায় গ্রেপ্তার হন ৫১৭ জন৷ ১৭ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং ঢাকায় ৩৮টি নতুন মামলা ঠুকে দেওয়া হয়৷

রাজধানীর সিএমএম আদালতের গেটে গ্রেপ্তার শিক্ষার্থীদের স্বজনদের প্রিজন ভ্যান ঘিরে কান্নাকাটি ও আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে৷ স্বজনেরা অভিযোগ করেন— তল্লাশির নামে পুলিশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালায় এবং ব্যাপক অর্থকড়ি হাতানোর জন্য অনৈতিক ‘আটক বাণিজ্য’ চলায়৷ ২৩ জুলাই পর্যন্ত স্বৈরাচারী সরকারের নির্বিচার গুলিতে নিহতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যায়৷

কোটা প্রজ্ঞাপন, সীমিত ব্রডব্যান্ড ও গণমাধ্যমের তোপ: পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ২৩ জুলাই আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটা রেখে সরকারি চাকরির প্রজ্ঞাপন জারি করে তৎকালীন প্রশাসন৷ তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তদন্তের আশ্বাস দিলেও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী আবাসিক হল খুলতে অস্বীকার করেন এবং র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ কঠোর ব্যবস্থার হুমকি অব্যাহত রাখেন৷

টানা ৬ দিন পুরো দেশ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২৩ জুলাই রাতে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ফিরলেও সাধারণ মানুষ ছিল সুবিধার বাইরে৷ দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে রাখায় তথ্য বিপর্যয়, অর্থনীতি ধসে পড়া এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াবের নেতৃবৃন্দ৷ তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্য সরবরাহ চালুর দাবি জানান৷ তৎকালীন শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও প্রশাসনিক এই দমন-পীড়নই মূলত সে সময় পুরো দেশকে চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করেছিল৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *