২০২৪ সালের ২ আগস্ট—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল পুরো দেশ। রাজধানীর উত্তরা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও নরসিংদী পর্যন্ত রাজপথ পরিণত হয়েছিল রণাঙ্গনে। পুলিশের গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং তৎকালীন সরকারি দলের সশস্ত্র হামলার মুখেও দমে যায়নি আন্দোলনকারীরা।

জুমার নামাজের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, সায়েন্স ল্যাব ও শাহবাগ এলাকা মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত ‘দ্রোহযাত্রা’য় সৃষ্টি হয় জনসমুদ্র। আন্দোলনকারীরা রাজপথে পুলিশের সাঁজোয়া যান (এপিসি)-এর ওপর উঠে উল্লাসপ্রকাশ করে এবং দেয়ালে লাল কালিতে লিখে দেয় প্রতিবাদী বাণী।

সারাদেশে রক্তক্ষয় ও দুইজনের মৃত্যু কর্মসূচি চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। খুলনায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী তুমুল সংঘর্ষে পিটুনিতে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। হবিগঞ্জে হামলা ও পুলিশের গুলিবর্ষণে এক পথচারী প্রাণ হারান এবং গুলিবিদ্ধ হন অর্ধশতাধিক। এছাড়া সিলেট, নরসিংদী, উত্তরা, দাউদকান্দি ও লক্ষ্মীপুরে অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হন।

ডিবির হেফাজত থেকে মুক্ত ৬ সমন্বয়কের বিস্ফোরক বিবৃতি এর আগের দিন ১ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) থেকে মুক্তি পাওয়া আন্দোলনের প্রধান ৬ সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুম ২ আগস্ট এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করেন।

তারা জানান, জোরপূর্বক ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে, খাবার টেবিলে বসিয়ে ভিডিও ধারণ করে এবং পরিবারের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের মিথ্যা ঘোষণা দেওয়ানো হয়েছিল। কোনো অবস্থাতেই আন্দোলন থামবে না এবং গণগ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের লড়াই অব্যাহত থাকবে বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ইন্টারনেট সেন্সরশিপ ও তৎকালীন সরকারের প্রতিক্রিয়া গণআন্দোলন দমন করতে সেদিনও বেশ কয়েক ঘণ্টা ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাম পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে, ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, ‘সরকার বনাম শিক্ষার্থী গেম খেলে একটি মহল ফায়দা লুটছে।’ তিনি পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিচার বিভাগীয় কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের কথা উল্লেখ করেন।

তবে রাজপথের চিত্র ছিল ভিন্ন; ভয়ভীতি, প্রতিরোধ আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ২ আগস্টের এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক দফার অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *