বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ আকারের সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে৷ বুধবার (১৫ জুলাই) ভোরে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের উপকূলীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর আকাশচুম্বী হামলায় ৭ ইরানি সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন৷ এই হামলার কয়েক মিনিটের মাথায় তীব্র পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান৷ ইরান সরাসরি বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে, যার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে এক চরম যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে৷
সেন্টকমের ৭ ঘণ্টার অভিযান ও ইরানের ক্ষয়ক্ষতি: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিশেষ প্রেস বার্তায় জানায়— বুধবার ভোরে তাদের বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশপাশ এবং ইরানের উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রায় সাত ঘণ্টাব্যাপী এক নিখুঁত ও বিধ্বংসী অভিযান পরিচালনা করেছে৷ এই অভিযানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও ফাইটার জেট থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করতে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়৷
অন্যপ্রান্তে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে— ইলাম, সিস্তান ও বেলুচিস্তান, হোভেইজা, চাবাহার, কেশম ও হেঙ্গাম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় ও সীমান্ত এলাকায় এই মার্কিন হামলা আঘাত হেনেছে৷ চাবাহার এলাকায় একটি সেনা ব্যারাকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে সাত সেনা সদস্য নিহত হন৷ হামলা চলাকালে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (Bushehr Nuclear Power Plant) আশপাশে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে প্রতিপক্ষের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে৷ ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক জরুরি বুলেটিনে জানিয়েছে— এই মার্কিন হামলায় সেনা সদস্য ছাড়াও ২ জন বেসামরিক নারী নিহত এবং অন্তত ২৬০ জন নাগরিক আহত হয়েছেন৷
৩ দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে আইআরজিসির পাল্টা আঘাত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিধ্বংসী হামলার জবাবে ইরানের শক্তিশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) তীব্র ক্ষোভে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে৷ আইআরজিসি দাবি করেছে— তারা বাহরাইনে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী ‘পঞ্চম নৌবহরের’ (Fifth Fleet) প্রধান ঘাঁটি, কুয়েতের আবদুল্লাহ বন্দরে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক লজিস্টিক কেন্দ্র এবং জর্ডানের আল-আজরাক বিমান ঘাঁটিতে (Al-Azrak Air Base) একাধিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে নিখুঁত হামলা চালিয়েছে৷
কুয়েতের সেনাবাহিনী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে— তারা তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রুপক্ষের একাধিক ড্রোন প্রতিহত করছে৷ জর্ডান প্রশাসনও দাবি করেছে— বুধবার ভোরে ইরান থেকে জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটির দিকে ছুড়ে দেওয়া তিনটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তাদের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশেই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে৷
হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি ও ট্রাম্পের বক্তব্য: এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর আইআরজিসি বিশ্ববাসীকে পুনরায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে— মার্কিনীদের এই অন্যায় হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে৷ পাশাপাশি তারা ইঙ্গিত দিয়েছে— প্রয়োজনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের ব্যবহৃত অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি ও তেল রপ্তানি পথও ইরান সামরিক শক্তি দিয়ে অবরুদ্ধ করে দিতে পারে৷
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে (Fox News) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন— ‘বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতির কথা বিবেচনা করে আমি অত্যন্ত উদারতার সাথে আপাতত ইরানের তেল ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সরাসরি হামলার নির্দেশ দিইনি৷ তবে তেহরান যদি তাদের আচরণ না বদলায়, তবে ভবিষ্যতে সেসব মূল তেল স্থাপনাও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হবে৷’
সংঘাতের আবহে জাতিসংঘে (UN) পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে ইরান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছে যে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যকার আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারকের ৪২টি দ্বিপাক্ষিক শর্ত সরাসরি লঙ্ঘন করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সেই শান্তি চুক্তি ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে৷
