রাজধানীর চিরচেনা যানজট নিরসন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল ও ক্যামেরা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)৷ পরীক্ষামূলক প্রয়োগে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর, প্রথম পর্যায়ে ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি ইন্টারসেকশন বা মোড়কে এই আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে৷ এই বিশাল বাস্তবায়ন কার্যক্রমে ডিএমপির সঙ্গে যৌথভাবে যুক্ত থাকবে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন৷
গত সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই মহাপরিকল্পনাটি উপস্থাপন করা হয়৷
বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন নেই, ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় হবে ট্রাফিক: উচ্চপর্যায়ের এই সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রধান সড়কগুলোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করতে ধাপে ধাপে এই আধুনিকায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে৷ সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বরাদ্দ বা বিশেষ তহবিলের প্রয়োজন হবে না৷ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পুলিশের নিজস্ব তহবিল থেকেই এই যুগান্তকারী উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব৷
বুয়েটের দেশীয় প্রযুক্তি ও এআই ক্যামেরার ম্যাজিক: এর আগে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনের মোড়গুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা হয়েছিল৷ দেশীয় প্রযুক্তিতে সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিগরি দক্ষতায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এই সিগন্যাল বাতিগুলো তৈরি করে৷ বাতিগুলো একই সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুসারে ট্রাফিক পুলিশ চাইলে ম্যানুয়ালিও বা হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন৷
সিগন্যাল স্থাপনের এই প্রজেক্টে অর্থায়ন করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন৷ নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব পালন করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ এবং পুরো কার্যক্রমের নিখুঁত সমন্বয় করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)৷
চলতি বছরের ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এই ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে ডিএমপি৷ এই নতুন এআইভিত্তিক ক্যামেরায় ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ লঙ্ঘন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে৷ পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে, আইন লঙ্ঘনকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে এবং যান চলাচল ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷
বিগত ৬০ বছরের ব্যর্থতার ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ: ডিটিসিএ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় সর্বপ্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে৷ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সেগুলো সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে৷ পরবর্তীতে ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের বড় ঋণ সহায়তায় ৬৮টি স্থানে সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হলেও সেগুলো কার্যকর করা যায়নি এবং ২০০৯ সালের মধ্যে তা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়৷ এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও ৯১টি ইন্টারসেকশনে সিগন্যাল বাতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও তা মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি৷ শুধু তাই নয়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জাপানি সংস্থা জাইকার ঋণে ৪টি ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও সেগুলো কিছুদিন পরই অকার্যকর হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে৷
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিশ্বব্যাংক ও জাইকার অতিত ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস পার হয়ে ডিএমপির এই এআইনির্ভর বর্তমান উদ্যোগ নগরবাসীকে বড় স্বস্তির বার্তা দিলেও, এর ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ৷
