ইসলামের ইতিহাসে তায়েফের ঘটনা এক হৃদয়বিদারক ও অনন্য অধ্যায়। মক্কার কুরাইশদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন মক্কার অদূরে অবস্থিত তায়েফ নগরে। সেখানে টানা ১০ দিন গোপনে ও প্রকাশ্যে, বাজারে বাজারে ঘুরে তিনি পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে তায়েফবাসীর সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন।
কিন্তু তায়েফের মানুষ নবীজি (সা.)-এর এই আহ্বানে সাড়া তো দেয়নি, উল্টো চরম দুর্ব্যবহার ও পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়েছিল তাঁর ওপর। তায়েফের নেত্রীস্থানীয় ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে সাধারণ মানুষকে মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। একপর্যায়ে তারা এলাকার উচ্ছৃঙ্খল বালকদের নবীজি (সা.)-এর পেছনে লেলিয়ে দেয়।
উচ্ছৃঙ্খল সেই যুবকেরা আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে এবং গালাগাল করতে শুরু করে। পাথরের নির্মম আঘাতে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়, এমনকি তাঁর পরিহিত জুতা মোবারকও রক্তে ভরে যায়। একপর্যায়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ও ক্লান্তিতে তিনি মাটিতে বসে পড়েন।
চরম এই নির্যাতনের মুহূর্তেও তিনি তায়েফবাসীর ওপর ক্ষুব্ধ না হয়ে, মহান আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত আকুলভাবে হাত তোলেন এবং নিজের দুর্বলতার কথা স্বীকার করে এক ঐতিহাসিক দোয়া করেন। (সিরাতে ইবনে হিশামে বর্ণিত এই দোয়ায় তিনি বলেন)—
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে স্বীয় দুর্বলতা, আমার কলা-কৌশলের স্বল্পতা এবং মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ করছি। হে সর্বাধিক দয়ালু! তুমি দুর্বলদের প্রভু, আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কার কাছে ন্যস্ত করছ? … তুমি যদি আমার উপর রাগান্বিত না হও তাহলে আমি কোনোকিছুই পরওয়া করি না। তবে নিঃসন্দেহে তোমার ক্ষমা আমার জন্য সর্বাধিক প্রশস্ত ও প্রসারিত…”
মোনাজাতে তিনি আরও বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তাঁর সব প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর তৌফিক ছাড়া কোনো অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা বা তাঁর আনুগত্য করা সম্ভব নয়। ইসলামের ইতিহাসে তায়েফের এই ঘটনা ও নবীজি (সা.)-এর ধৈর্য উম্মতের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষার আলো হয়ে আছে।
