বিশ্ব ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক জনমতের সমীকরণে ঘটে গেছে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক ওলটপালট৷ বিশ্বের এক বিশাল অংশের মানুষের কাছে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পরাশক্তি চীন অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে৷ ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর বৈশ্বিক জনমত জরিপে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে৷ উল্লেখ্য, ২০০২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক মনোভাব ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি নিয়ে ট্র্যাকিং শুরু করার পর গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে এই প্রথমবার আমেরিকার চেয়ে চীনের এমন একচেটিয়া আধিপত্য ও রেকর্ড ফলাফল নথিবদ্ধ করল৷

৩৬ দেশের জনমত ও ভৌগোলিক সমীকরণ: বিশ্বের ৩৬টি স্বাধীন দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর চালানো এই সুনিপুণ জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে— ২৫টি দেশের সাধারণ মানুষই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি স্পষ্ট ইতিবাচক মনোভাব ও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন৷ বিপরীতে, বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়েছে৷

ইউরোপ ও এশিয়ার পরাশক্তি ও প্রভাবশালী দেশ যেমন— স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস এবং কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতেও জনমত এখন ব্যাপকভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে৷ এছাড়া ইতালি, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীনের রাষ্ট্রীয় জনপ্রিয়তা পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে৷

বিপরীতে, জরিপ করা ৩৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ৬টি দেশে এখনও ওয়াশিংটনের জনপ্রিয়তা বেইজিংয়ের চেয়ে কিছুটা বেশি বজায় রয়েছে৷ এর মধ্যে আমেরিকার কট্টর ও সামরিক মিত্র হিসেবে পরিচিত পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান এবং ইসরাইল অন্যতম৷ জরিপে দেখা গেছে— সাধারণত উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের কারণে জনপ্রিয়তা বেশি, আর ধনী দেশগুলোতে তা কিছুটা নেতিবাচক৷ তবে ব্যতিক্রম উচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ সিঙ্গাপুর, যেখানে মানুষ চীনের প্রতি অত্যন্ত ইতিবাচক৷ সামগ্রিকভাবে এশিয়ার মধ্যে চীনের প্রতি সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে পাকিস্তান (৯০%) এবং সবচেয়ে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে জাপান (১১%)৷

শি জিনপিং বনাম ডোনাল্ড ট্রাম্প: বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক সংকট পরিচালনার ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প— কার ওপর বিশ্ববাসীর আস্থা ও বিশ্বাস বেশি? পিউ রিসার্চের জরিপে দেখা গেছে— সামগ্রিকভাবে বিশ্বনেতা হিসেবে দুজনের প্রতিই বৈশ্বিক আস্থা বেশ কম (৫০ শতাংশের নিচে)৷ তবে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই আস্থার দৌড়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে আছেন৷

গবেষকরা জানিয়েছেন— বিশ্বজুড়ে শি জিনপিংয়ের শান্ত ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে তাঁকে নিয়ে মানুষ খুব একটা চরমপন্থী বা উগ্র মতামত না দিলেও, ট্রাম্পের আগ্রাসী কথাবার্তার কারণে মানুষ তাঁর প্রতি তীব্র ইতিবাচক অথবা চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন৷ ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ ৬৮% আস্থা দেখিয়েছে ফিলিপাইন, আর মার্কিন নীতির কারণে সর্বনিম্ন মাত্র ৪% আস্থা এসেছে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম থেকে৷

জনপ্রিয়তার এই ধসের মূল কারণ কী? আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে— দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পররাষ্ট্রনীতিই এই আকাশ-পাতাল জনপ্রিয়তার পার্থক্যের পেছনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে৷ জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্বের প্রায় ৭৫% মানুষের সরাসরি ধারণা— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের স্বার্থে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবসময় অতিরিক্ত ও অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করে থাকে৷ অন্যদিকে চীনের ক্ষেত্রে এই আগ্রাসী হস্তক্ষেপের হার মানুষের চোখে মাত্র ৪৫%৷

বিশেষ করে জরিপ চলাকালীন গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ট্রাম্পের উগ্র ও কঠোর বক্তব্য, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার মার্কিন প্রকাশ্য চক্রান্ত এবং ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার মতো ওয়াশিংটনের নীতিগত অস্থিরতা বিশ্ববাসীকে চরম উদ্বিগ্ন করে তুলেছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে— চীনের শাসনব্যবস্থা একনায়কতান্ত্রিক ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একজন কঠোর কমিউনিস্ট নেতা হওয়া সত্ত্বেও, বর্তমান টালমাটাল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিকে অনেক দেশ বেশি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য মনে করছে৷ পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেইজিংয়ের বিলিয়ন ডলারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাই চীনের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান চালিকাশক্তি৷

তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *