ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী ১৮ জুলাই: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ১৮ জুলাই দেশজুড়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা
Featured, Latest, News, Politics, Popular, Trending #abongtv, #BangladeshNews, #CompleteShutdownBD, #InternetBlackoutBangladesh, #JulyRevolution2024আজ ১৮ জুলাই৷ ২০২৪ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল৷ ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত ক্র্যাকডাউন চালানো হয় এবং জোরপূর্বক আবাসিক হলগুলো সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হয়৷ স্বৈরাচারের এই অন্যায়ের ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দাউ দাউ করা এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সারা দেশে জ্বলে ওঠে৷ ঢাকার বিভিন্ন নামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় শিক্ষার্থীরা সেদিন স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে এক দুর্বার ও ঐতিহাসিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন৷
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ১৮ জুলাই দেশজুড়ে সর্বাত্মক ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা৷ আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিল— কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সোয়াটের বর্বরোচিত হামলা ও খুনের সুনির্দিষ্ট বিচার, খুনিদের ফাঁসি, সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার৷ ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক এই অবরোধ কর্মসূচির কারণে ঢাকাসহ সারা দেশ স্থবির ও অচল হয়ে পড়ে৷ বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর মেট্রোরেল এবং সন্ধ্যা ৭টায় বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়৷
১৮ জুলাই সকাল থেকেই বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলায় মেরুল বাড্ডা এলাকায় পুরোপুরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়৷ বেলা ১১টার দিকে মেরুল বাড্ডার কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ এবং বাইরে অবস্থান নেন ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি ও রাবার বুলেটে অসংখ্য আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন৷ তবে সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিরোধের মুখে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে বের হতে পারছিলেন না পুলিশ সদস্যরা৷ পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার ঘেরাওয়ের মুখে টিকতে না পেরে বেলা তিনটার কিছু আগে দুটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা পুলিশ সদস্যদের ছাদ থেকে অলৌকিকভাবে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী প্রশাসন৷
শিক্ষার্থীদের এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ১৮ জুলাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় ঢাকার আপামর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ৷ রাজধানীর বাড্ডা ছাড়াও সেদিন উত্তরা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়৷ ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর ও রাজশাহীসহ প্রায় সারা দেশে এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে৷ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও কলঙ্কময় দিনগুলোর একটি ছিল এই ১৮ জুলাই৷ সারা দেশে ফ্যাসিবাদের বুলেটে এদিন ২৭ জন (ঢাকায় ১৯ ও ঢাকার বাইরে ৮ জন) বীর ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং আহত হন প্রায় দেড় হাজার মানুষ৷ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সারা দেশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করে স্বৈরাচারী সরকার৷
১৮ জুলাই দিবাগত রাত ১২টায় সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক জরুরি খুদে বার্তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (যিনি পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন) জানান, ১৯ জুলাইও সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে৷
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত বিক্ষোভের সময়ে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার হয়েছে৷ ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৮ জুলাই তৎকালীন বিতর্কিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সেনাবাহিনী, ডিজিএফআই এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ‘কোর কমিটির’ বিশেষ গোপন সভায় নির্বিচার গ্রেপ্তার অভিযান ও ব্লক রেইড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল৷ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি ও বেআইনি নির্দেশেই মূলত ১৮ জুলাই রাতে দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে বাংলাদেশের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার লাইভ তথ্য গোপন করা, নির্বিচার গ্রেপ্তার চালানো এবং শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে বাধা দেওয়া৷ ১৮ জুলাইয়ের সেই মহান শহীদদের রক্ত ও আত্মত্যাগের পথ ধরেই পরবর্তীতে চব্বিশের ৫ আগস্ট অর্জিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা৷
