আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের নতুন প্রাদুর্ভাবে এক ভয়াবহ মানবিক ও স্বাস্থ্যগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে৷ দেশটিতে এ পর্যন্ত এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে৷
আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কঙ্গোর সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই লোমহর্ষক তথ্য প্রকাশ করা হয়৷
আক্রান্তের ৩১ শতাংশই মারা যাচ্ছেন: দেশটির জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইএনএসপি) সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী— গত ১৫ই মে কঙ্গোয় আনুষ্ঠানিকভাবে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দেড় মাসে ১ হাজার ৪০৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে অন্তত ৪৩৮ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে৷ এর ফলে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর গড় হার দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশেরও বেশি, যা চিকিৎসকদের উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে৷
মোটরসাইকেলে লাশ পাচার, বড় শহরে আতঙ্ক: ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক শহর কিসাঙ্গানিতেও সম্প্রতি প্রথম একজন ইবোলা রোগী শনাক্তের খবর পাওয়া গেছে৷ আইএনএসপি জানিয়েছে— ২৪ বছর বয়সী এক গর্ভবতী নারীর মরদেহের নমুনা পরীক্ষার ফল ইবোলা পজিটিভ আসে৷
কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে— নিহত ওই গর্ভবতী নারী মূলত ইতুরি প্রদেশের নিয়া নিয়া স্বাস্থ্য অঞ্চলে মারা যান৷ কিন্তু তাঁর পরিবার চিকিৎসকদের না জানিয়ে সংক্রমণ লুকাতে মোটরসাইকেলে করে গোপনে তাঁর মরদেহ প্রায় ১৫ লাখ বাসিন্দার বিশাল শহর এবং শোপো provinces-এর রাজধানী কিসাঙ্গানিতে নিয়ে আসে৷ ইবোলায় মৃত ব্যক্তির শরীর অত্যন্ত সংক্রামক থাকে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়৷ ফলে কিসাঙ্গানি শহরে এখন এই ভাইরাসের গণসংক্রমণের রানিং আশঙ্কা তৈরি হয়েছে৷
নেই কোনো টিকা, কেন্দ্রস্থল ইতুরি: এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য ইবোলার ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) প্রজাতিকে দায়ী করা হচ্ছে৷ অত্যন্ত সংক্রামক ও বিপজ্জনক এই ধরনের কোনো অনুমোদিত টিকা কিংবা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই৷ তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে— কিছু পরীক্ষামূলক প্রতিষেধকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল খুব শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে৷
দেশটিতে চলমান প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ, যেখানে মোট মৃত্যুর ৮৩ শতাংশেরও বেশি ঘটনা ঘটেছে৷ এই প্রদেশটির সঙ্গে উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, যা এখন পার্শ্ববর্তী উত্তর কিভু এবং দক্ষিণ কিভু প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে৷ সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র সংঘাত চলার কারণে ইবোলার প্রকৃত ব্যাপকতা নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন কঙ্গোর কর্মকর্তারা৷
লক্ষণ ও সংক্রমণ পদ্ধতি: বিজ্ঞানীদের মতে— ইবোলার বৈজ্ঞানিক নাম ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’৷ এর ছয়টি ধরনের মধ্যে ‘জাইর’ প্রজাতিটি ২০১৪ সাল থেকে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে৷ তবে এটি বাতাসে ছড়ায় না৷ আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি কিংবা মলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়ায়৷ ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক বাহক মনে করা হয়৷ এছাড়া শিম্পাঞ্জি, গরিলা, হরিণ ও সজারুও এই ভাইরাস বহন করে মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে৷
এর মূল উপসর্গ হলো— হঠাৎ তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া-বমি এবং শেষ পর্যায়ে নাক, মুখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ হওয়া৷ রক্তপাতের জেরে রোগীর দ্রুত মৃত্যু হয় বলে একে ‘হেমারোজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণ জ্বরও বলা হয়৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী— গত ৫০ বছরে আফ্রিকায় এই রোগে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং এর স্বাভাবিক মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে৷
সূত্র: এএফপি, ডব্লিউএইচও।
