ডিপিডিসি-ডেসকোর রেকর্ড ঘাটতি, দাম বাড়ানোর আবদারে দিশেহারা ৪ কোটি ৯৫ লাখ গ্রাহক
Featured, Latest, News, Popular, Trending #BERC, #DESCO, #DPDC, #ElectricityPriceHike, #MiddleClassCrisis, #PDB, #SlabRestructuringজ্বালানি তেল, এলপিজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যে দিশেহারা সাধারণ মানুষের ওপর এবার বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বড় বোঝা চাপতে যাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) আবাসিক গ্রাহকদের ‘বিলিং স্ল্যাব’ বা ধাপ পুনর্গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি খড়্গ নামবে দেশের প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। আগামী ১ জুন থেকেই নতুন এই দাম কার্যকর করতে চায় বিতরণ সংস্থাগুলো।
দ্য ডেইলি স্টারের পর্যালোচনা করা নথিতে দেখা গেছে, বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামোর কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিতরণ সংস্থাগুলোর সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, দাম সমন্বয় না করা হলে ২০২৬ অর্থবছরে এই ঘাটতি ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ঘাটতি ও পুঞ্জীভূত লোকসানের দায় এখন গ্রাহকের ওপর চাপানোর তোড়জোড় চলছে। এই দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর আগামী ২০ ও ২১ মে ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
পিডিবির প্রস্তাবের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো আবাসিক গ্রাহকদের বিলিং স্ল্যাব পুনর্গঠন। বর্তমানে মাসে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য কম দরের (প্রতি ইউনিট ৫.২৬ টাকা) সুবিধা পান। নতুন প্রস্তাবে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী মধ্যবিত্তদের এই সুবিধা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে কেউ ২০০ ইউনিট ব্যবহার করলে পুরো ইউনিটের বিলই উচ্চ হারে গণনা করা হবে।
বর্তমানে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ ছাড়া ২০০ ইউনিট বিদ্যুতের বিল আসে ১,২৯৫ টাকা। শুধু স্ল্যাব পরিবর্তন হলেই একই পরিমাণ বিদ্যুতের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ১,৪৪০ টাকায়। আর যদি প্রতি ইউনিটের দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২০ পয়সা করা হয়, তবে বিল দাঁড়াবে ১,৬৪০ টাকা—যা বর্তমানের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। পিডিবির হিসাবে, এই স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণে ২৩ শতাংশ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারসহ মোট ৩৫ শতাংশ আবাসিক গ্রাহক সরাসরি বাড়তি বিলের ফাঁদে পড়বেন।
আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি সেচ পাম্প, নির্মাণ খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনগুলোর বিদ্যুতের দামও ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ১৯ থেকে ২৯ শতাংশ এবং ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের জন্য ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ডিপিডিসি ও ডেসকো খুচরা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে দেশের ৭৭ শতাংশ গ্রাহককে সেবা দেওয়া আরইবি সবচেয়ে কম বৃদ্ধির আবেদন জানিয়েছে। সংস্থাগুলোর দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, অফিস পরিচালন ব্যয় ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে চলমান প্রকল্পের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-ও তাদের ১,২৮০ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসান ঢাকতে সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “স্ল্যাব পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার এখতিয়ার বিতরণ সংস্থাগুলোর নেই। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের সুরক্ষার জন্যই স্ল্যাব প্রথা চালু করা হয়েছিল, যা বাতিল করলে মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিইআরসি) রায়কে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা।” তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১০-১৫ বছর ধরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাম নিয়ে সংস্থাগুলো যে মুনাফা করেছে, তার কোনো হিসাব নেই। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না এনে, উন্নয়নের নামে করা সব অবাস্তব খরচের দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
