ঢাকার আশপাশেই একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল: স্বাভাবিক ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া নাকি বড় বিপর্যয়ের সংকেত?
Featured, Latest, News, Popular, Trending, Weather #abongtv, #BangladeshNews, #BlindFaults, #DhakaFaultLine, #EarthquakeRiskBDসাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে৷ বিশেষ করে, শেষ হওয়া কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্রবিন্দু খোদ রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় আবহাওয়াবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মনে বড় প্রশ্ন উঠছে— এগুলো কি কেবলই স্বাভাবিক ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে ধেয়ে আসা বড় কোনো শক্তিশালী ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে তাৎক্ষণিক কোনো আতঙ্কের কারণ না থাকলেও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে৷
উৎপত্তিস্থল ঘুরেফিরে ঢাকার আশপাশেই: সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৮টা ২৮ মিনিটে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা মাঝারি মাত্রার এক ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে৷ রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। তবে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিশ্চিত করেছে যে, ভূমিকম্পটির প্রকৃত উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়োত কবীর জানান, নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে সেটি মূলত রূপগঞ্জ এলাকার মধ্যেই পড়ে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও তার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘটিত বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার একেবারে কাছাকাছি। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ দশমিক ২ মাত্রার এবং এর আগে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ওই ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়, যা ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে। গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী এই ভূকম্পনে ঢাকায় ৪ জন, নরসিংদীতে ৫ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১ জনসহ মোট ১০ জন নিহত হন এবং আহত হন সাড়ে চার শতাধিক মানুষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, “সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প টেকটোনিক কার্যকলাপের ফল হতে পারে, আবার কোনো সক্রিয় ফল্টের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। অনেক সময় নতুন ফল্ট সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।” ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ— এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব বলয়ের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় দেশে ঘন ঘন এমন কম্পন হচ্ছে।
এগুলো কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার আশপাশে হওয়া ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই, তবে এগুলো মানুষকে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অতীতের সেই ফল্টগুলো, যেগুলো অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে এবং বর্তমানে তাদের ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তির চক্রের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঢাকার কাছাকাছি শ্রীমঙ্গল (১৯১৮ সালে ৭.৬ মাত্রা) ও বগুড়ার শেরপুর (১৮৮৫ সালে ৭.১ মাত্রা) এলাকায়। এগুলো ঢাকা থেকে ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থিত। অধ্যাপক আনসারী বলেন, “ঐতিহাসিক তথ্যের বিচারে ঢাকার জন্য ভবিষ্যতে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আসার বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেটি কবে হবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়; ২০ বছরও লেগে যেতে পারে। এটি হলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।”
ঢাকার কোন এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ? ভূতত্ত্ববিদদের মতে, কোনো এলাকা কতটা নিরাপদ তা নির্ভর করে মূলত ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং অবকাঠামোর মানের ওপর। ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, ঢাকার উত্তরাংশে মধুপুরের শক্ত লাল মাটি রয়েছে, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল। শুধু মাটির গঠন বিবেচনা করলে রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁওয়ের মতো এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ।
তবে বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী মনে করেন, কেবল মাটির গঠন দেখে কোনো এলাকাকে নিরাপদ বলা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না ভবনগুলোর কাঠামোগত মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও সেখানকার মূল সমস্যা ভবনের চেয়ে সরু রাস্তা, যা দুর্যোগের সময় দ্রুত মানুষ সরিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলবে।
ঢাকার জন্য বাড়তি শঙ্কা ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ভেতরে সরাসরি কোনো পরিচিত দৃশ্যমান ফল্ট লাইন নেই। তবে মায়ানমার থেকে নোয়াখালী প্লেট বাউন্ডারি, ডাউকি ফল্ট ও মধুপুর ফল্টের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা অদৃশ্য ফল্ট। এ ধরনের ফল্ট ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না বলে সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে সহজে শনাক্ত করা যায় না। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলে দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট শনাক্ত করা হয়েছে।
এই অদৃশ্য ফল্টগুলো আগে থেকে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় সতর্কবার্তা পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। তাই সাম্প্রতিক সময়ের কম্পনগুলোকে তাৎক্ষণিক বড় কোনো বিপর্যয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস না বলা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় এখন থেকেই ভবনের নির্মাণ মান নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
