মোদি সরকারের ‘পাকিস্তানকে একঘরে’ করার কৌশল কি উল্টো ফল দিচ্ছে? আল জাজিরার বিশ্লেষণে নতুন বিতর্ক
Featured, Latest, News, Politics, Popular, Trending #abongtv, #AlJazeeraAnalysis, #BangladeshNews, #DonaldTrump, #IndiaPakistanRelations, #NarendraModi, #ShehbazSharifপাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে এবং দেশটিকে বৈশ্বিকভাবে ‘একঘরে’ করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক কৌশল এখন উল্টো ফল দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বড় প্রশ্ন উঠেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান অত্যন্ত চতুরতার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক পরাশক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুনর্গঠন ও জোরদার করে কূটনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় অবস্থানে চলে গেছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত ২০১৬ সালে ভারতের একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানকে বিশ্বমঞ্চে সম্পূর্ণ ‘একঘরে’ বা বিচ্ছিন্ন করবে ভারত। কিন্তু তার সেই ঘোষণার এক দশক পর বর্তমান বাস্তব চিত্রটা অনেকটাই ভিন্ন। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন চীনসহ বিশ্বের একাধিক শক্তিশালী দেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং একই সাথে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তাদের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া সম্পর্ক পুনরায় উন্নত করেছে।
প্রতিবেদনে একটি বড় চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেস-টু-ফেস বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে। এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে।
অন্যদিকে, ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কৌশলগত চাপের মুখে পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের মতামতে উঠে এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার জোরালো প্রচেষ্টা থাকলেও, বাস্তবে ইসলামাবাদ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিজেদের সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
বিখ্যাত দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অনুসৃত নেতিবাচক কৌশলটি ‘অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ’ হয়েছে। এর পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান নিজের হারিয়ে যাওয়া অবস্থান সফলভাবে শক্ত করতে পেরেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত ও তথ্যযুদ্ধেও (Information War) পাকিস্তান আন্তর্জাতিক জনমত নিজেদের পক্ষে গঠনে উল্লেখযোগ্যভাবে সফলতা দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ করা হয় যে, ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র সীমান্ত উত্তেজনার পর সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এই মধ্যস্থতা বিশ্বমঞ্চে ভারতের একক কূটনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা দুর্বল করেছে বলে দাবি করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে বেইজিংয়ের সাথে ইসলামাবাদের গভীর প্রতিরক্ষা এবং বিশেষ অর্থনৈতিক সহযোগিতা (CPEC) সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্ক সম্প্রতি বহুগুণ ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে ‘জঙ্গিবাদ ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না’— এই কঠোর নীতি অনুসরণ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে আসছে। তবে ভারতের এই অনমনীয় অবস্থানের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট ‘সার্ক’ (SAARC) গত কয়েক বছর ধরে কার্যত সম্পূর্ণ অচল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। পাকিস্তান একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে চীন— দুই যুযুধান পক্ষের সাথেই সুভারসাম্য বজায় রেখে নিজের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করছে। বিপরীতে, ভারত তার অনমনীয় ও কঠোর অবস্থানের কারণে কিছু কিছু আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও গ্যাঁড়াকলের মুখে পড়ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখনও চূড়ান্ত রকমের অনিশ্চিত। দুই দেশের মধ্যে কাশ্মীরসহ অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যুতে নতুন করে সংলাপ ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করা ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো স্থায়ী শান্তি বা সমাধান সম্ভব নয়।
সূত্র: আল জাজিরা
