রামিসা-আছিয়া হত্যাকাণ্ডে ফুঁসছে দেশ; দেড় যুগ পেরোলেও রসু খাঁর ফাঁসি না হওয়ায় ক্ষোভ
Featured, Latest, News, Politics, Popular, Trending #abongtv, #BangladeshNews, #ChildProtectionBD, #CrimeInvestigation, #JudicialSystemError, #JusticeForRamisa, #KashimpurJail, #RasuKhanCase, #SerialKilerBangladesh, #SocialJustice, #StopViolenceAgainstWomenরাজধানীর পল্লবীতে মাত্র ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় গভীর শোক, তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সারাদেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষের আলোচনায় এখন একটাই জ্বলন্ত প্রশ্ন— আর কত নারী ও নিষ্পাপ শিশুকে এমন পাশবিকতার শিকার হতে হবে?
বিশেষ করে দেশে শিশু ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতন ও নারী হত্যার মামলাগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বিচার ঝুলে থাকা, তদন্তে চরম ধীরগতি, উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং চূড়ান্ত সাজা কার্যকরে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নতুন করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।
পল্লবীর রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর দেশের বিচারহীনতার এই বাস্তবতায় আবারও দেশজুড়ে তীব্র আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ও নৃশংস সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর নাম। প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার পৈশাচিক দায় স্বীকার করার পরও, গ্রেপ্তারের দেড় যুগ (১৭ বছর) পেরিয়ে গেলেও রসু খাঁর ফাঁসির রায় এখনও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের চরম অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।
জনসাধারণ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর স্পষ্ট দাবি, দেশে ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা এক ধরনের প্রচ্ছন্ন ‘দায়মুক্তির’ সুযোগ পাচ্ছে। কিছুদিন আগে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা ৮ বছর বয়সী শিশু আছিয়া হত্যাকাণ্ডেও একই ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। আছিয়া ধর্ষণের শিকার হওয়ার কয়েকদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। সেই মামলায় মূল অভিযুক্ত হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও, উচ্চ আদালতে আপিল ঝুলে থাকার কারণে আজও সেই রায় কার্যকর হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মামলা সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ মূলত একজন ছোটখাটো চোর ছিলেন। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর একটি মসজিদের ফ্যান চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদে তার এই ভয়ংকর সিরিয়াল কিলিংয়ের রোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে আসে। পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে রসু খাঁ জানিয়েছিল, যৌবনে এক প্রেমিকার কাছে ব্যর্থ হয়ে সে নারীদের ওপর প্রতিশোধ নিতে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ১০১ জন নারীকে হত্যা করা। তার শিকার হওয়া অধিকাংশ নারীই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নিরীহ পোশাকশ্রমিক।
রসু খাঁর বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলা হয়, যার মধ্যে ৯টি হত্যা এবং ১টি নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলা। তবে নিহত অনেক নারীর পরিচয় পুরোপুরি শনাক্ত করা না যাওয়ায় তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ২০১৮ সালে রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। পরে উচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও এখনও তা ফাঁসির কাষ্ঠে কার্যকর করা হয়নি। বর্তমানে সে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে (ফাঁসির সেল) বন্দি দিন কাটাচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মত: দেশের অপরাধ বিশ্লেষক ও গবেষকরা বলছেন, অপরাধের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অবিলম্বে কার্যকর না হওয়াই সমাজে এমন জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তির প্রধানতম কারণ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন এই বিষয়ে তার বিশেষ বিশ্লেষণে বলেন, “অপরাধীরা যদি মানসিকভাবে নিশ্চিত থাকে যে অপরাধ করলে খুব দ্রুত সাজা কার্যকর হবে, তাহলে সমাজে অপরাধের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী পরিবারকে সময়ের সাথে সাথে আর্থিকভাবে ও মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং একই সাথে সামাজিক চাপও ফিকে হয়ে আসে। ফলে বহু আলোচিত ঘটনাও একসময় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়।” তাঁর মতে, রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কঠোরভাবে সক্রিয় থাকলে বিচার প্রক্রিয়ায় দ্রুত গতি আনা সম্ভব।
