গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তা সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হাতে আটক হওয়া এবং পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আন্তর্জাতিক কর্মীদের ওপর চালানো হয়েছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। বহরের আয়োজক ও বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সরকার জানিয়েছে, ইসরাইলি হেফাজতে থাকার সময় এসব কর্মীরা গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের কারণে বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং অন্তত ১৫ জন কর্মী তাদের ওপর সরাসরি ধর্ষণসহ ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন।

গত মঙ্গলবার গাজা উপত্যকায় জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টাকারী আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের এই বহরটিকে আটকাতে সমুদ্রসীমায় ৫০টি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে অভিযান চালায় ইসরাইলি বাহিনী। সেখান থেকে ৪৩০ জন আন্তর্জাতিক নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বৃহস্পতিবার ইসরাইল থেকে বহিষ্কার করার পর ইউরোপের কর্মীরা তুরস্ক হয়ে নিজ দেশে ফিরতে শুরু করার পরই এই পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সামনে আসে।

সহায়তা বহর থেকে মুক্তি পেয়ে রোমে পৌঁছানোর পর ইতালীয় অর্থনীতিবিদ লুকা পোগি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমাদের সবাইকে জোরপূর্বক নগ্ন করা হয়েছিল, মাটিতে ফেলে বুট জুতো দিয়ে লাথি মারা হয়েছিল। আমাদের অনেকের ওপর বৈদ্যুতিক টেজার গান ব্যবহার করা হয়েছে, কেউ কেউ গুরুতর যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং কাউকে আইনজীবীর সাথে যোগাযোগের সামান্য সুযোগও দেওয়া হয়নি।”

ইতালির একটি আইনি সূত্র জানিয়েছে, রোমের কৌঁসুলিরা ইতিমধ্যে অপহরণ, নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিষয়ে গভীর তদন্ত শুরু করেছেন এবং ইতালি ফিরে আসা কর্মীদের আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য গ্রহণ করছেন।

জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইস্তাম্বুল পৌঁছানোর পর কনস্যুলার কর্মকর্তারা জার্মান কর্মীদের শারীরিক পরীক্ষা করেছেন। বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত এবং তাদের চিকিৎসা চলছে। এই ঘটনাকে ‘পরম অগ্রাধিকার’ উল্লেখ করে বার্লিন ইসরাইলের কাছে সম্পূর্ণ ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

অন্যদিকে ফরাসি নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনের সমন্বয়কারী সাব্রিনা চারিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পাঁচজন ফরাসি অ্যাক্টিভিস্টকে গুরুতর জখম অবস্থায় তুরস্কের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের কারো কারো পাঁজরের হাড় বা মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিছু ফরাসি নাগরিকও ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার বিশদ অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে আদ্রিয়েন জুয়ান নামের এক ফরাসি নাগরিকের পিঠ এবং বাহুতে থাকা ভয়াবহ আঘাতের দাগের ছবি রয়টার্স দ্বারা যাচাইকৃত হয়েছে। এছাড়া স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস জানিয়েছেন, তাদের ৪৪ জন কর্মীর মধ্যে অন্তত ৪ জন মারাত্মক জখম হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন।

কারাগারে আটক আন্তর্জাতিক মানবিক কর্মীদের মাটিতে চেপে ধরে রাখার একটি সংবেদনশীল দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপহাস ও উপহাসমূলক ভিডিও পোস্ট করেছেন ইসরাইলের চরমপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। এই ভিডিও ফুটেজ আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

সুইডেনে ন্যাটোর বৈঠকের ফাঁকে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, তিনি তার সমস্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সমকক্ষদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন, যাতে বিতর্কিত ইসরাইলি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য দ্রুত একটি যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র আয়োজকরা লিখেছেন, “ধর্ষণসহ অন্তত ১৫টি যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। খুব কাছ থেকে রবার বুলেট ছুড়ে মারা হয়েছে। অসংখ্য মানুষের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে।” তারা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, “বিশ্বের নজর যখন আমাদের কর্মীদের দুর্ভোগের দিকে, তখন আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই যে এটি ফিলিস্তিনি জিম্মিদের ওপর ইসরাইলের প্রতিদিনকার বর্বরতার একটি সামান্য ঝলক মাত্র।”

এদিকে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *