২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ: বৈষম্য, আকাশছোঁয়া খরচ আর কড়া ভিসানীতিতে ফিকে হচ্ছে সাধারণ সমর্থকদের স্বপ্ন
Entertainment, Featured, Latest, News, Politics, Popular, Sports, Trending #abongtv, #BangladeshNews, #CorporateFootball, #DiscriminationInFootball, #ExpensiveTickets, #ExpensiveWorldCup, #FIFAWorldCup2026, #FootballCrisis, #GianniInfantino, #USAVisaPolicy, #USAVisaRulesফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি আর সীমান্তের দেয়াল ভেঙে কোটি মানুষ এক হয়ে যায় একই আবেগে। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে সেই চেনা উন্মাদনার আড়ালে এবার দানা বাঁধছে এক নতুন ও নজিরবিহীন বিতর্ক। ক্রীড়া বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চোখে, নানা জটিলতার কারণে এটি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ‘বৈষম্যমূলক’ বিশ্বকাপ।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করছে এবারের মেগা আসর। প্রথমবারের মতো ফুটবল ইতিহাসে অংশ নিতে যাচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA) এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সফল বিশ্বকাপ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করলেও, রূঢ় বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। আকাশছোঁয়া টিকিটের মূল্য, আমেরিকার কড়া ভিসানীতি, তিন দেশের বিশাল ভ্রমণ দূরত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন পরিস্থিতি সাধারণ মধ্যবিত্ত সমর্থকদের জন্য এই বিশ্বকাপকে প্রায় নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে এবার বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের শুধু টিকিট পেলেই হচ্ছে না, গুণতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তিনটি বিশাল দেশে ছড়িয়ে থাকা ভেন্যুগুলোর কারণে এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে লাগছে দীর্ঘ বিমানযাত্রা। অনেক সমর্থককে একই টুর্নামেন্টে খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বারবার যাতায়াত করতে হতে পারে। ফলে আবাসন, অভ্যন্তরীণ পরিবহন ও খাবার মিলিয়ে খরচ পৌঁছে যাচ্ছে কয়েক হাজার ডলারে।
সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে টিকিটের অগ্নিমূল্য নিয়ে। ব্ল্যাক মার্কেট ও বিভিন্ন অফিশিয়াল ক্যাটাগরিতে ম্যাচের টিকিটের মূল্য কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি মেক্সিকোর উদ্বোধনী আসরের সাধারণ টিকিটও ৩ থেকে ১০ হাজার ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ১১ লাখ টাকা) মধ্যে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সাধারণ দর্শকদের জন্য স্বল্পমূল্যের কিছু টিকিট ছাড়লেও, কোটি কোটি দর্শকের চাহিদার তুলনায় সেই সংখ্যা ছিল নামমাত্র।
শুধু আকাশছোঁয়া ব্যয়ই নয়, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের সাধারণ সমর্থকদের জন্য সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতি। আবেদনকারীদের আর্থিক তথ্য, চাকরির সুনির্দিষ্ট বিবরণী থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত কার্যক্রম পর্যন্ত অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। এমনকি কিছু উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য ৫ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ভিসা বন্ড’ (জামানত) চালু করার মতো নজিরবিহীন পথে হেঁটেছে ওয়াশিংটন।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও এই বৈষম্যকে আরও উস্কে দিয়েছে। হাইতি ও ইরানের নাগরিকদের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এবং সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ রয়েছে। টুর্নামেন্ট ঘিরে ফিফার চাপে কিছু নিয়ম সাময়িক শিথিল করা হলেও সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের উদ্বেগ কাটেনি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অভ্যন্তরীণ অভিবাসন অভিযান (ICE-এর তৎপরতা) এবং বর্ণগত প্রোফাইলিংয়ের আশঙ্কা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় কোনো অভিবাসন অভিযান চালানো হবে না—মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন কোনো শতভাগ নিশ্চয়তা এখনও মেলেনি, যা লাতিন ও আফ্রিকান সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সর্বজনীন উৎসব থেকে করপোরেট টাইকুন ও ধনকুবেরদের ভিআইপি প্রদর্শনীতে পরিণত হচ্ছে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যেখানে এই মেগা আসর থেকে রেকর্ড ১১ বিলিয়ন ডলার আয়ের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা বলছেন, সেখানে মাঠের প্রাণ—অসংখ্য অতিসাধারণ ফুটবলপ্রেমী শুধু খরচের চোটে টিভি পর্দার সামনে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবুও ফুটবলের প্রতি জাদুকরী ভালোবাসা থেমে নেই। এত সমালোচনা, বৈষম্য আর অনিশ্চয়তার মাঝেও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মারাদোনা-মেসি-পেলের ঐতিহ্যবাহী এই রাজকীয় ট্রফির লড়াইয়ের জন্য। কারণ সব বিতর্ক ছাপিয়ে বিশ্বকাপ এখনো ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে সবচেয়ে বড় আবেগের নাম।
