আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ন্ত্রণে ইরানের সক্ষমতা দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর এবং শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সুফান সেন্টার’-এর নির্বাহী পরিচালক কলিন ক্লার্ক। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিস্ফোরক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
কলিন ক্লার্ক আল জাজিরাকে বলেন, “ইরানিরা খুব ভালো করেই জানে যে যেকোনো বড় ধরনের যুদ্ধ জয়ে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণই হচ্ছে মূল ‘তুরুপের তাস’। তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে, সমুদ্রের বুকে মাইন স্থাপন করে এবং কাঁধে বহনযোগ্য আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে সক্ষম। আর এর মাধ্যমে তারা চোখের পলকে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”
সুফান সেন্টারের এই শীর্ষ কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবগত। সম্ভবত মার্কিন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সদর দফতরগুলোতে এই নির্দিষ্ট যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নিয়ে অসংখ্য গোপন কাগজপত্র, গবেষণা ও প্রতিবেদন তৈরি রয়েছে। যেখানে এই রুটটি বন্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের সুদূরপ্রসারী পরিণতি এবং কীভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়ানো যায়, তার বিশদ বিবরণ ও কৌশল আগে থেকেই লিপিবদ্ধ আছে।
ক্লার্ক আরও বিশ্লেষণ করে বলেন, এই প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান তেহরানকে এমন এক ধরনের কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে, যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বা বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা নেই। তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “আপনি যদি রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্যে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেন, তবে আপনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক জগতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু কেবল এই প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া? ইরান আন্তর্জাতিক চাপ ও সামরিক শক্তি মোকাবিলা করে এই রুটটি অনির্দিষ্টকাল ধরে বন্ধ বা অবরুদ্ধ করে রাখতে পারে।”
ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বৈশ্বিক চাহিদার একটি বিশাল অংশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই রুটে ইরানের যেকোনো ধরণের কঠোর পদক্ষেপ বা অবরুদ্ধকরণ বিশ্ব বাজারে জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে, যা বৈশ্বিক মন্দা তৈরির জন্য যথেষ্ট।
