বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আজকাল আমার নিজেরই মনে হয় যে আমি ঢাকা শহরে থাকব না; আমি আমার দেশের অন্য কোনো শহরে গিয়ে থাকব। কারণ, এটা আর বাসযোগ্য মনে হয় না।” আজ শনিবার (৬ জুন) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) আয়োজিত ‘দক্ষিণের জানালা’র শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকার তীব্র বায়ু, পরিবেশ ও পানি দূষণের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আপনি ঘর থেকে বের হলেই যে অক্সিজেন গ্রহণ করেন, সেটাও দূষিত। আপনি যদি একটি সরকারি হাসপাতালে যান, সেখানে ঢোকাই যায় না। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে। সেই অবস্থা থেকে যদি আমরা বের হতে না পারি, প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনে এগিয়ে আনতে না পারি, তাহলে এতক্ষণ যে স্বপ্নের কথা বলা হলো, সেগুলো স্বপ্নই থেকে যাবে। কারণ, আমরা কি সত্যিই সেই মুক্ত বাতাস নিতে পারব?”

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আরও বেশিদিন যেন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্য দূষণমুক্ত অক্সিজেন নিশ্চিত করা এবং বাসযোগ্য শহর ও নগর গড়ে তোলার জোরদার আন্দোলন প্রয়োজন। বিএনপি মহাসচিব উল্লেখ করেন, শুধু সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করলেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হবে না; যারা সরকারের নীতিনির্ধারণ করছেন, ঢাকা শহর পরিচালনা করছেন এবং বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন, তাদেরকেও কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, “হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পর প্রকল্প চলছে এই ঢাকা নগরের জন্য। কিন্তু মানুষ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে, নাগরিকরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছে, সেই বিষয়গুলো কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। সেই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এগোতে হবে।” তিনি মনে করিয়ে দেন, সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারের একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচিত মেয়র ও স্বশাসিত করপোরেশনে আরও গভীর চিন্তা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নদীগুলোর করুণ দশা নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, “কলেজজীবনে আমরা প্রায়ই বুড়িগঙ্গায় নৌকায় চড়ে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এখন সেই নদীর কাছেও যাওয়া যায় না। এত দূষিত, এত দুর্গন্ধ। আমার কাছে মনে হয়, ঢাকা শহরের অনেক সমস্যার মূলেই বোধহয় এই বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার পানি আজ যে অবস্থায় আছে, শীতলক্ষ্যাও প্রায় একই অবস্থার দিকে যাচ্ছে। তাহলে ঢাকা শহরের নাগরিকরা যাবে কোথায়?”

তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, দেশে এত শত শত প্রকল্প হয়, কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার কোনো দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর প্রকল্প তৈরি হয় না। তিনি নিজে সমবায় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানান, বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগকে কীভাবে পূর্বের চেহারায় ঠিক করা যায়, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। ‘প্রকল্প শেষ, তো সব শেষ’—এমন মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি থেকে সংশ্লিষ্টদের বের হয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা শহরের পানির বর্তমান তীব্র সংকট প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল সাম্প্রতিক এক ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভার বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “ঢাকা শহরের পানির অবস্থা খুবই ভয়াবহ। একটি বড় অংশের পানি মোটেও সেবনযোগ্য বা সুপেয় নয়। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হাজার মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি অদূর ভবিষ্যতে ঢাকার জন্য একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা বিপদ ডেকে আনছে।” এই ক্রান্তিলগ্ন মোকাবিলায় চলমান উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি সুপরিকল্পিত কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেন মন্ত্রী।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *