রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার বর্বরোচিত মামলায় মাত্র ৬ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটিই প্রথম এত দ্রুততম সময়ে রায় দেওয়ার ঘটনা। এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো। আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যেই উচ্চ আদালতে রামিসা হত্যাকাণ্ডের বাকি সমস্ত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব।
তিন মাসের মধ্যে উচ্চ আদালতের প্রক্রিয়া শেষ করার কারিগরি ব্যাখ্যা দিয়ে আইনমন্ত্রী জানান, যদি এক সপ্তাহের মধ্যে মামলার যাবতীয় নথি বা ফাইল হাইকোর্টে আসে, তাহলে তার পরের সপ্তাহ থেকেই পেপার বুক প্রস্তুতের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব। এরপর বিশেষ বিবেচনায় ১৫ দিনের মধ্যে পেপার বুক সম্পন্ন করা গেলে মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চে উপস্থাপন করা যেতে পারে। হাইকোর্টে দুই সপ্তাহের মধ্যে শুনানি শেষ হলে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগে যাবে। এভাবে সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে আনুমানিক তিন মাস সময় লাগতে পারে।
মো। আসাদুজ্জামান আরও বলেন, দেশের প্রত্যেকটি মামলাকে এভাবে ‘ফাস্ট ট্র্যাকে’ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণেই আমরা একটি বাস্তবসম্মত স্থায়ী পথ খুঁজছি, যাতে এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলাগুলো যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে নেওয়া যায়। তিনি স্পষ্ট করেন, আজ যে ফার্স্ট ট্র্যাকে রামিসা হত্যার বিচার হলো, এটা সরকার একা করেনি। সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি যদি ১৫ জুন পর্যন্ত থাকা বিচারকদের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল না করতেন, তাহলে এই ফার্স্ট ট্র্যাক বিচার সরকারের পক্ষে সম্ভব হতো না।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “কার্যত মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রামিসার মতো একটি বেদনাদায়ক ঘটনার বিচার সম্পন্ন করতে আমরা সক্ষম হয়েছি, যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।” তিনি একটি ঐতিহাসিক উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, এর আগে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৮৮২ সালে নদীয়া সেশন কোর্টে মুল্লুক চাঁদ নামে এক ব্যক্তি কর্তৃক তার ৯ বছর বয়সী কন্যাকে হত্যার মামলার বিচার মাত্র একদিনে সম্পন্ন হয়েছিল। এরপরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এত দ্রুত বিচার আর কোথাও সম্ভব হয়নি। আমরা আইনের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করেছি এবং ঘোষিত শাস্তিতে আমরা আপাতত সন্তুষ্ট। আশা করি, উচ্চ আদালতেও (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) এই ফাঁসির রায় বহাল থাকবে।
এর আগে আজ রোববার বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত রামিসা হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) দেন। একই সঙ্গে আদালত প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু রায়ের এই জরিমানার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
৬ কার্যদিবসে যেভাবে শেষ হলো বিচার (মামলার ক্রনোলজি):
- ১৯ মে: রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে সোহেল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।
- ২৪ মে: ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আদালতে নিখুঁত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন এবং মামলাটি দ্রুত বিচারের জন্য শিশু ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
- ১ জুন: ঈদুল আজহার ছুটি শেষে প্রথম কার্যদিবসেই আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। অভিযোগ গঠনের দিন প্রধান আসামি সোহেল ‘ডলার’ নামে কাল্পনিক এক ব্যক্তিকে দায়ী করার চেষ্টা করলেও তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করেন যে, এই নৃশংসতায় অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল না।
- ২ জুন: মাত্র একদিনে মামলার ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে নিহত রামিসার বাবা, মা, বোন ও স্বজনসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত।
- ৩ ও ৪ জুন: ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন ট্রাইব্যুনালে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন। বিচারিক আদালতগুলোতে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ বা ছুটি চললেও ট্রাইব্যুনালের ছুটি বাতিল করে আজ এই রায় দেওয়া হলো।
