দেড়শ বছরের পুরোনো আইন বাতিল, অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোরোধে পাস হলো ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’

দেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল জুয়া, অনলাইন বেটিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক আর্থিক প্রতারণা কঠোরভাবে দমনের লক্ষ্যে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, 1867’ পুরোপুরি রহিত ঘোষণা করা হয়েছে৷ এর পরিবর্তে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে আধুনিক ও যুগোপযোগী ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’৷ নতুন এই কড়া আইনে অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং (বাজি), বাজিকর (Bookmaker), ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া ও ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট এবং ভিপিএন সহ মোট ২৪ ধরনের ডিজিটাল ও প্রচলিত বিষয়কে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে৷

আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ৷ অপরাধের ধরন অনুযায়ী নতুন আইনে ১৪ ধরনের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে৷

আইন পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংজ্ঞায়িত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন— বিদ্যমান ১৮৬৭ সালের জুয়া আইনটি দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো এবং বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর ও সাইবার অপরাধভিত্তিক জুয়ার আধুনিক ধরন মোকাবিলায় এটি আর যথেষ্ট ছিল না৷ সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জুয়া নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে৷ এরই ধারাবাহিকতায় এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের সুপারিশের ভিত্তিতে শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে এই নতুন সমন্বিত আইনটি আনা হয়েছে৷

তিনি আরও জানান— বর্তমানে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি এবং ভিপিএন-এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংঘটিত জুয়া, অর্থপাচার ও প্রতারণা দেশের যুবসমাজ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

অপরাধের ধরন ও শাস্তির বিধান: নতুন আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১৪ ধরনের অপরাধ নির্ধারণ করা হয়েছে৷ নিচে প্রধান প্রধান অপরাধ ও তার শাস্তির তালিকা তুলে ধরা হলো:

  • সাধারণ জুয়ার অপরাধ: সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড৷
  • অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড৷
  • অনলাইন বেটিং বা বাজি ধরা: সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড৷
  • বাজিকর (Bookmaker) হিসেবে কার্যক্রম: সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড৷
  • ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা৷ এ ছাড়া দোষী ব্যক্তিকে স্থায়ী বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ক্রীড়াঙ্গনে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে৷
  • ভিপিএন ও মিরর সাইট ব্যবহার: ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট বা ডোমেইন সার্ভিস ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড৷
  • ভুয়া সিম ও এমএফএস জালিয়াতি: ভুয়া বা ঘোস্ট সিম এবং বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা করলে ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড৷ এটি সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে হলে তা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা দণ্ডে রূপ নেবে৷

সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য কড়া বার্তা: নতুন আইনে জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ বা অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটিদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে৷ এই অপরাধে জড়িত থাকলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷

ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ও টাস্কফোর্স গঠন: আইনে বলা হয়েছে— অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে দেশের সাইবার ট্রাইব্যুনালে৷ এই আইনের অধীনে সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে৷ তদন্তের ক্ষেত্রে সাব-ইন্সপেক্টরের (এসআই) নিচের পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না৷

এ ছাড়া আদালত বা সরকার চাইলে জনস্বার্থে জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ ও চ্যানেল ব্লক বা অপসারণ করতে পারবে৷ আইনটি কঠোরভাবে বাস্তবায়নে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ’ প্রণয়ন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স’ গঠন করা হবে বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *