ঈশ্বরদীতে শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হামলা ও ভাঙচুরে অনুষ্ঠান পণ্ড

পাবনার ঈশ্বরদীতে একজন শিক্ষকের অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং দ্বন্দ্বের জেরে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে৷ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবকে অনুষ্ঠানের অতিথি না করায় তার অনুসারীরা লাঠিসোটা নিয়ে এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ হামলায় অনুষ্ঠানস্থলের মঞ্চ, চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য রান্না করা খাবার নষ্ট করে পুরো আয়োজনটি পণ্ড করে দেওয়া হয়৷

মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে৷ হামলায় কেউ গুরুতর আহত না হলেও বিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে৷

আমন্ত্রিত অতিথি ও ঘটনার সূত্রপাত: বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহুরুল ইসলাম জানান, তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের অবসরে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল৷ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম সরদারকে৷ এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) মোছা. শাহীনা আক্তার, সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) মো. কামরুজ্জামান শেখ, জেলা বিএনপির সাবেক মৎস্যবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রশিদ সরদার এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির দুলাল সরদারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল৷

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে উপজেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলাম সরদার এবং সলিমপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আলম প্রামাণিকসহ ১২ থেকে ১৫ জনের একটি দল লাঠিসোটা নিয়ে হঠাৎ অনুষ্ঠানমঞ্চে হামলা চালায়৷ তারা চোখের পলকে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করে এবং রান্নার ডেকচি উল্টে খাবার নষ্ট করে দেয়৷

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষোভ: বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. ফজলুর রহমান বলেন, স্থানীয় বিএনপির দীর্ঘদিনের গ্রুপিং কোন্দলের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে৷ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবকে অতিথি না করায় তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে এই ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে৷ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের রাজনৈতিক হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এতে এলাকায় সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে৷

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির দুলাল সরদার বলেন, একটি বিদ্যাপীঠের বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এ ধরনের হামলা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুঃখজনক ও ক্ষতিকর৷ বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে দ্রুত কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে৷

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও) মোছা. শাহীনা আক্তার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা অতিথিরা অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর আগেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটে৷ একজন শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠানে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷

অভিযুক্তদের বক্তব্য ও গ্রুপিংয়ের ইতিহাস: অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত উপজেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলাম সরদার এবং সলিমপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আলম প্রামাণিকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি৷

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া এলাকায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে৷ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের নেতৃত্বাধীন পক্ষের সঙ্গে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম সরদার এবং জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীদের বিরোধ দীর্ঘদিনের৷ স্থানীয়দের মতে, এই আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের জের ধরেই মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, যার সর্বশেষ কুফল ভোগ করতে হলো জগন্নাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই বিদায় অনুষ্ঠানকে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *