বিশ্বকাপে স্মরণকালের মহানাটকীয় লড়াই: ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধে কেপ ভার্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারাল আর্জেন্টিনা

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হলো এক অবিশ্বাস্য, নাটকীয় এবং সম্ভবত বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও শ্বাসরুদ্ধকর নকআউট ম্যাচের৷ ২০২৬ বিশ্বকাপের নবাগত দল আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ মিনিট পর্যন্ত যে বীরত্ব ও হার না মানা মানসিকতা দেখাল, তা ফুটবল রূপকথায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে৷ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ১২০ মিনিটের ৫ গোলের স্নায়ুক্ষয়ী থ্রিলার ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোনো রকমে হাফ ছেড়ে বাঁচল আর্জেন্টিনা৷ এই জয়ের মধ্য দিয়ে আসরের শেষ ষোলো বা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করলেন লিওনেল স্কালোনির শিষ্যেরা৷ তবে ম্যাচ হারলেও বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নিজেদের নামটি স্থায়ীভাবে খোদাই করে বিদায় নিল কেপ ভার্দে৷

রেকর্ডবুকে মেসির নতুন উচ্চতা ও প্রথমার্ধ: ম্যাচের শুরু থেকেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে ইতিবাচক ফুটবল খেলতে থাকে কেপ ভার্দে৷ তবে ম্যাচের ২৮তম মিনিটে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ থেকে নিখুঁত ও দূরদর্শী এক পাস বাড়ান ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ৷ লিওনেল মেসির চিরচেনা দৌড়ের লাইনেই ছিল সেই জাদুকরী বল৷ বলটি নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডি-বক্সের ভেতর মাত্র ৭ গজ দূরত্ব থেকে আলবিসেলেস্তে মহাতারকা এক জোরালো শট নেন, যা ঠেকানোর কোনো সাধ্য ছিল না কেপ ভার্দের গোলরক্ষক দোসিমার দিয়াজ ভোজিনহার৷

এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ অষ্টম ম্যাচে গোল করার এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড গড়লেন মেসি৷ একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের মোট গোলসংখ্যাকে ২০-এ নিয়ে গেলেন তিনি৷ নিজের রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন মেসি এবং ৩৬ পার করা এই ফুটবল জাদুকর এখনো তুঙ্গে থাকা ফর্ম দিয়ে প্রতিপক্ষকে ছিটকে দিচ্ছেন৷

দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দের রূপকথা ও ভোজিনহার বীরত্ব: দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা কিছুটা ছন্দ হারাতেই তার পূর্ণ সুযোগ নেয় লড়াকু কেপ ভার্দে৷ ম্যাচের ৫৯ মিনিটে ডেরয় দুয়ার্তের দুর্দান্ত এক গোলে মায়ামির স্টেডিয়ামে স্তব্ধতা নেমে আসে এবং স্কোরলাইন ১-১ এ পরিণত হয়৷ বিতর্ক ও তদন্তের মুখে থাকা অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস ডান প্রান্ত দিয়ে রক্ষণ চিরে বল বাড়িয়েছিলেন, আর সেই বল ধরে ফাঁকা জায়গা দিয়ে দ্রুত দৌড়ে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে জড়ান দুয়ার্তে৷ প্রথমার্ধে অ্যাসিস্ট করা লিসান্দ্রো মার্টিনেজ দ্রুত এগিয়ে এলেও দুয়ার্তেকে রুখতে পারেননি৷

এরপর ৯০ মিনিট পর্যন্ত সময়টা ছিল শুধুই কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার অতিমানবীয় বীরত্বের গল্প৷ মেসির নেওয়া দুটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক বাজপাখির মতো ওড়ান তিনি, আর আর্জেন্টিনার বেশ কয়েকটি নিশ্চিত আক্রমণ একাই পরাস্ত করেন৷ ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে৷

অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তা ও লিসান্দ্রো ম্যাজিক: অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই লিড পেতে মরিয়া আর্জেন্টিনা মায়ামিতে আক্রমণের ঝড় তোলে৷ ৯১ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বল আরেকজনের হালকা ছোঁয়া পেয়ে একপাশে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ে আসে৷ কেপ ভার্দের ডিফেন্ডাররা ভেবেছিলেন লিসান্দ্রো হয়তো ক্রস করবেন, কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই সেন্টারব্যাক সবাইকে বোকা বানিয়ে দুরূহ কোণ থেকে এক জোরালো শটে ভোজিনহাকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান (২-১)৷

তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সেই আনন্দও বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি আফ্রিকার লড়াকু দলটি৷ ১০৩ মিনিটে কেপ ভার্দের সিডনি ক্যাব্রাল বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে ভেতরের দিকে কাট-ইন করেন৷ ফিরতি বল পেয়ে ডান পায়ে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শট নেন তিনি৷ বলটি এমন কোণ দিয়ে জালে জড়াবে তা হয়তো আর্জেন্টিনার বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজের কল্পনাতেও ছিল না৷ ক্যাব্রালের এই গোলটির পর স্কোরলাইন ২-২ সমতায় রূপ নেয়৷

আত্মঘাতী গোলে রক্ষা ও আর্জেন্টিনার হাফ ছেড়ে বাঁচা: ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ১০৮ মিনিটে আসে সেই নাটকীয় মুহূর্ত৷ মেসির নেওয়া নিখুঁত কর্নার কিকে বক্সের ভেতর উঁচুতে লাফিয়ে দুর্দান্ত হেড নেন ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো৷ বলটি সরাসরি জালে জড়িয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তা কেপ ভার্দের একজন ডিফেন্ডারের হাতে লেগে ভেতরে ঢোকে৷ ফলে আত্মঘাতী গোলের সুবাদে ৩-২ ব্যবধানে লিড পায় আর্জেন্টিনা৷ ম্যাচের শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত অবিশ্বাস্য আক্রমণ চালিয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা করে গেছে কেপ ভার্দে৷ আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়েছে চরম উৎকণ্ঠায়৷ অবশেষে রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই স্কালোনির শিষ্যরা ও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যেন নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন৷ গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়েকে কাঁপিয়ে দেওয়া কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও যে ফুটবল উপহার দিল, তা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রানিং থ্রিলার ম্যাচ হিসেবে গণ্য হবে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *