জানাজা ঘিরে চরম যুদ্ধ উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘চরম প্রতিশোধের’ কড়া হুঁশিয়ারি দিল ইরান

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় জানাজা ও পাঁচ দিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর ও চূড়ান্ত সামরিক হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান৷ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আম্বিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার আলী আব্দুল্লাহি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন— জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি কোনো ধরনের আকাশপথ বা ড্রোন হামলা চালায়, তবে তার জন্য ‘চরম প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে৷

কমান্ডার আলী আব্দুল্লাহি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে বলেন— “আমরা ইরানের শত্রুদের, বিশেষ করে আমেরিকা এবং জায়নবাদী ইসরায়েলকে যেকোনো ধরণের ভুল পদক্ষেপ বা নতুন আগ্রাসন থেকে বিরত থাকার কড়া সতর্কবার্তা দিচ্ছি৷ দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলা বা আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে৷”

পেন্টাগনের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ৪ মাস পর জানাজা: উল্লেখ্য— গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন আচমকা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) নামক এক সংঘাতময় যুদ্ধ অভিযান শুরু করলে ওই দিনই বিমান হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি৷ এরপর যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় তাঁর মরদেহ বিশেষভাবে সংরক্ষণ করার পর আগামী রোববার ভোর থেকে রাজধানী তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় জানাজা শুরু হচ্ছে৷

এই ঐতিহাসিক শেষকৃত্যে ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে৷ ঘোষিত সূচি অনুযায়ী— তেহরানসহ ইরানের মোট পাঁচটি প্রধান শহরে জানাজা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর আগামী ৯ই জুলাই খামেনিকে তাঁর নিজ জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে৷ ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা— এই পাঁচ দিনের বিশাল আয়োজনে দেশ-বিদেশের প্রায় দেড় কোটিরও বেশি মানুষের ঐতিহাসিক উপস্থিতি হতে পারে৷ বিপুল এই স্মরণকালের জনসমাগমকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য মার্কিন বা ইসরাইলি বিমান হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না তেহরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড৷

আহত নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও কূটনৈতিক রণকৌশল: এদিকে যুদ্ধকালীন চরম পরিস্থিতিতে খামেনির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হলেও তিনি স্বস্তিতে নেই৷ বাবার মৃত্যুর দিন মার্কিন বিমান হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন৷ ফলে তীব্র নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং নতুন করে ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার ঝুঁকির মুখে তিনি বাবার জানাজায় সরাসরি অংশ নেবেন না বলে বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে ইরান প্রশাসন৷

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে— খামেনির এই দীর্ঘ শেষকৃত্যকে বৈশ্বিক মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি বড় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার৷ বিশেষ করে মাশহাদে শেষ দাফনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে মার্কিন বিমান হামলার তীব্র আশঙ্কার কথাই বারবার উল্লেখ করছেন পর্যবেক্ষকেরা৷

ট্রাম্পের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের সমান্তরালে তেহরানের চাল: এই শেষকৃত্যের সময় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা রাজনৈতিক জল্পনা ও সমীকরণ চলছে৷ কারণ— তেহরানে যখন খামেনির জানাজা শুরু হতে যাচ্ছে, ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশটির ২৫০তম ঐতিহাসিক স্বাধীনতা দিবসের (সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল) রাষ্ট্রীয় জমকালো আনুষ্ঠানিকতা পালিত হবে৷

ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে— ওয়াশিংটনের এই ঐতিহাসিক উৎসবের দিনেই ইরান পাঁচ দিনব্যাপী বিশাল আন্তর্জাতিক আয়োজন করেছে৷ এর মাধ্যমে বিশ্ব গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হোয়াইট হাউজের সমান্তরালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অনড় ও শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে তেহরান৷ ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই বৃহৎ আয়োজনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই এখন যুদ্ধের রানিং উত্তেজনা বিরাজ করছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *