শত কোটি টাকার ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি করপোরেট গ্যারান্টর (জামিনদার) হওয়া সত্ত্বেও আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেডকে ১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি (LC) খোলার এক বিশেষ ও নজিরবিহীন অনুমতি দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক৷ সরকারের দেওয়া বিশেষ এই সুবিধার আওতায় আগামী ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক(৩) ধারার কঠোর আইনি বিধান কার্যকর হবে না৷ আজ সোমবার (৬ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে৷
আইন শিথিল ও প্রজ্ঞাপনের রানিং শর্তাবলী: বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে— ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতাবলে আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারির ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ তবে এই বিশেষ সুবিধার আওতায় দেওয়া কোনো ঋণের কারণে রাষ্ট্র বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতি সৃষ্টি করা যাবে না৷ এ ছাড়া ভবিষ্যতে এই বিশেষ ঋণ সুবিধার বিপরীতে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের নতুন আর্থিক প্রণোদনা বা সহায়তা দাবি করতে পারবে না৷
দেশের প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী— কোনো খেলাপি ঋণের জামিনদার বা করপোরেট গ্যারান্টররাও সরাসরি ঋণখেলাপি হিসেবেই বিবেচিত হন৷ ফলে আইনত তারা নতুন কোনো ঋণ সুবিধা বা পণ্য আমদানির এলসি খোলার ব্যাংকিং সুযোগ পান না৷ তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে এই সুনির্দিষ্ট চিনি শোধনাগার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ওই কঠোর আইনি বিধান আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পুরোপুরি শিথিল থাকবে৷
৬৯৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের রানিং চিত্র: সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সূত্রে জানা গেছে— আব্দুল মোনেম সুগার রিফাইনারি মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের একটি বড় খেলাপি ঋণের করপোরেট গ্যারান্টর হিসেবে রয়েছে৷ আব্দুল মোনেম লিমিটেডই হলো দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপ আব্দুল মোনেম গ্রুপের প্রধান ও মূল প্রতিষ্ঠান৷
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের মার্চের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী— দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক, বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ দেশের মোট ২৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আব্দুল মোনেম লিমিটেডের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯৮ কোটি টাকা৷ এর মধ্যে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের পাওনাই রয়েছে প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা৷ গত বছরের আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি এসব বিশাল খেলাপি ঋণ বিশেষ শর্তে পুনর্গঠন বা রিশিডিউলিং করার আবেদন করেছিল৷ এরপর গত ৭ জুন শতভাগ নগদ মার্জিনে এলসি খোলার বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদন জানায় শোধনাগার কর্তৃপক্ষ৷
জরিমানা এড়ানো ও আবুল খায়ের গ্রুপের ‘স্টারশিপ সুগার’: চিনি শোধনাগার কর্তৃপক্ষ তাদের আবেদনে উল্লেখ করেছিল— অপরিশোধিত চিনি আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের একাধিক কোম্পানির সাথে তাদের বড় বড় চুক্তি কার্যকর রয়েছে৷ সময়মতো এলসি খুলতে না পারলে আন্তর্জাতিক নিয়মে প্রতিদিন প্রায় ২৩ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ বা ডেমারেজ গুনতে হতে পারে৷ পাশাপাশি দেশে বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি চিনি শোধনাগার পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকায় আমদানি ব্যাহত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির সরবরাহেও বড় ধরনের ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিতে পারে৷
বর্তমানে এক বিশেষ বাণিজ্যিক বিক্রয়চুক্তির আওতায় এই চিনি শোধনাগারটি দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ আবুল খায়ের লিমিটেড পরিচালনা করছে৷ প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত চিনি বর্তমানে বাজারে ‘স্টারশিপ সুগার’ ব্র্যান্ড নামে নতুন করে বাজারজাত করা হচ্ছে৷ তবে আব্দুল মোনেম গ্রুপ থেকে আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে শোধনাগারটির মালিকানা হস্তান্তরের অফিশিয়াল ও আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া এখনো রানিং রয়েছে৷
