রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বর্বরোচিত ক্র্যাকডাউন ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শহীদ হওয়া অনেকের লাশ রাষ্ট্রীয়ভাবে গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক৷ আজ রোববার (১৯ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন৷
লাশ গুমের রাষ্ট্রীয় অপচেষ্টা ও প্রকৃত সংখ্যা বিতর্ক: ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের সর্বশেষ অগ্রগতি ও খসড়া খতিয়ান জানতে আজ ট্রাইব্যুনালে আসেন হেফাজতে ইসলামের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল৷ চিফ প্রসিকিউটরের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন— ‘বর্তমানে তদন্তের মাধ্যমে শুধুমাত্র নিহত যাদের প্রাথমিক ও সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, খসড়া তালিকায় কেবল তাদের সংখ্যাটিই উঠে এসেছে৷ কিন্তু আমরা আন্দোলনের শুরু থেকেই দৃঢ়ভাবে বলছি যে, ওই রাতে অনেকেরই লাশ উদ্ধার বা খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ কাজেই সেসব তথ্য এই মুহূর্তে নথিপত্রে সরাসরি আনার সুযোগ মেলেনি৷ কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন ফ্যাসিষ্ট সরকারের স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শাপলার শহীদদের মরদেহ গুম করার চূড়ান্ত অপচেষ্টা চালিয়েছিল৷ আর এই কুখ্যাত কারণে বহুসংখ্যক নিখোঁজ শহীদের আজ পর্যন্ত কোনো হদিস মেলেনি৷’
হেফাজতে ইসলামের এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও উল্লেখ করেন যে— ৫ মে-র শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে দেশের ধর্মপ্রাণ তৌহিদী জনতা ছাড়াও সমাজের সব শ্রেণির মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন৷ ফলে সাধারণ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, মেহনতি শ্রমিকসহ তৎকালীন স্বৈরাচার বিরোধী ঘরানার প্রায় সব রাজনৈতিক দলের তৃণমূল কর্মীরাও ওই রাতের শহীদের তালিকায় রয়েছেন৷ কারণ নাস্তিকতাবিরোধী ও অধিকার আদায়ের সেই আন্দোলনটি সম্পূর্ণ সার্বজনীন রূপ নিয়েছিল৷
খসড়া প্রতিবেদন ও হেফাজতের সংশোধনী প্রস্তাব: তদন্ত সংস্থার খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে হেফাজতের অবস্থান জানতে চাইলে আল্লামা মামুনুল হক বলেন— ‘আমরা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিস্তারিত দেখিনি৷ তবে প্রাথমিকভাবে আমাদের লিগ্যাল টিম যতটুকু পর্যালোচনা করেছে, তাতে কিছু বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট দ্বিমত ও সংশোধন রয়েছে৷ আমরা নিজেদের মধ্যে আরেকটু অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ও আইনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আগামী দু-একদিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক সংশোধনের কথাগুলো প্রসিকিউশন টিমকে লিখিতভাবে অবহিত করব৷ এরপর প্রসিকিউশন সেটি কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে, তা দেখেই আমরা বলতে পারব যে তদন্তের অগ্রগতিতে আমরা কতটুকু সন্তুষ্ট হয়েছি৷’
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে মামলার ধারা ও দ্বিমতের বিষয় জানতে চাওয়া হলে তিনি গোপনীয়তার স্বার্থে তা এড়িয়ে যান৷ মামুনুল হক বলেন— ‘মামলাটি যেহেতু অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এখনো পুরোপুরি তদন্তাধীন রয়েছে বলে আমাদের চিফ প্রসিকিউটর মহোদয় জানিয়েছেন, তাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল হওয়ার আগে এ পর্যায়ে সব বিষয় গণমাধ্যমে উন্মুক্ত করা আইনিভাবে সম্ভব নয়৷ অতএব আমাদের মূল এজাহারে যে ধরনের অভিযোগ ও বিবরণ ছিল, সে অনুযায়ী এই খসড়া প্রতিবেদনটি অনেকটা কাছাকাছি ও সন্তোষজনক অবস্থানেই রয়েছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করি৷’ শাপলা চত্বরের নির্মম গণহত্যার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে বলে হেফাজত নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন৷
