গাজার ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে শুধুই স্পেন

অবশেষে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে৷ আজ রোববার দিবাগত রাত ১টায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা৷ এই হাইভোল্টেজ ট্রফি নির্ধারণী ম্যাচটি ঘিরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায়ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন ও আবেগঘন আগ্রহ৷ গাজার সিংহভাগ ফিলিস্তিনি সমর্থক এবার মনেপ্রাণে স্পেন জাতীয় দলকে সমর্থন করছেন, যার পেছনে ক্রীড়াশৈলীর চেয়েও ফিলিস্তিনের প্রতি স্পেনের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবিক অবস্থানই প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে৷

ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ও ক্রীড়াবিদদের প্রকাশ্য সংহতি: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— ২০২৪ সালের মে মাসে স্প্যানিশ সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনা উপেক্ষা করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়৷ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ তখন দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন— এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য ছিল ইসরাইল-ফিলিস্তিন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে এগিয়ে নেওয়া, গাজার মানবিক সংকট নিরসন করা, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং অবরুদ্ধ বেসামরিক মানুষের কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া৷

শুধু সরকারই নয়, স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের উদীয়মান তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল এবং ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলাসহ স্পেনের প্রথম সারির ক্রীড়াবিদরা বারবার গাজার মজলুম মানুষের প্রতি প্রকাশ্য সংহতি জানিয়েছেন৷ ফিলিস্তিনিদের কাছে স্প্যানিশদের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপগুলো ফুটবলের সবুজ গণ্ডি ছাড়িয়ে এক পরম প্রতীকী ও মানবিক গুরুত্ব বহন করছে৷ গাজার যুদ্ধাহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত বিশেষ দল ‘গাজা আল ইরাদা’ (গাজা ডিটারমিনেশন)-এর প্রধান কোচ হাতেম আল মাগরিবি আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন— ‘আজ পুরো ফিলিস্তিনি জাতি এক হয়ে চায় স্পেন বিশ্বকাপ জিতুক৷ আমাদের এই খেলোয়াড়রা যুদ্ধে তাদের হাত বা পা হারিয়েছে সত্য, কিন্তু যারা এই চরম বিপদে ফিলিস্তিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, খাঁটি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করার মানসিক শক্তি তারা কখনোই হারায়নি৷’ এ সময় তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানানোয় মিসরের জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হোসাম হাসানকেও বিশেষ ধন্যবাদ জানান৷

বিদ্যুৎহীন গাজায় ফাইনাল দেখার লড়াই ও প্যালেস্টাইন ক্লাবের প্রদর্শনী ম্যাচ: ফাইনাল ঘিরে বিশ্বজুড়ে যেমন উন্মাদনা বাড়ছে, ঠিক একইভাবে গাজাতেও ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে৷ তবে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি বাহিনীর অনবরত হামলা ও অবরোধের কারণে গাজার মাটিতে বসে বিশ্বকাপের সরাসরি ম্যাচ দেখা দিন দিন এক অলৌকিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে৷ গাজার সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপক আদনান আল আফিফি বলেন— ‘আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে বা কদাচিৎ বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল মানুষ খেলা দেখতে পারে৷ কিন্তু বর্তমানে গাজায় জ্বালানির চরম সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ চাকা বা জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না৷ এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ফিলিস্তিনের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের৷’

যুদ্ধের কারণে প্রায় হারিয়ে যাওয়া উৎসবমুখর ক্রীড়া পরিবেশ কিছুটা ফিরিয়ে আনতে গাজা সিটির ঐতিহাসিক ‘প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাব’-এ বিশ্বকাপ ফাইনাল উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করেন আল-আফিফি৷ বর্তমানে এটিই গাজা উপত্যকার একমাত্র সচল ফুটবল ক্লাব, যেখানে খেলোয়াড়রা নিয়মিত অনুশীলন ও খেলার সুযোগ পান৷ গত বৃহস্পতিবার ও শনিবার সেখানে ফিলিস্তিন ও স্পেনের জার্সি পরে দুটি দল বিশ্বকাপ ফাইনালের অনুকরণে দুটি রোমাঞ্চকর প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেয়৷ ম্যাচগুলোতে পেশাদার রেফারির পাশাপাশি প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাও রাখা হয়, যাতে খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ম্যাচের আসল পরিবেশ অনুভব করতে পারেন৷ ৩৭ বছর বয়সী আল-আফিফি বলেন— ‘পুরো পরিবেশ ছিল নিখাদ আবেগ ও ইতিবাচকতায় ভরা৷ স্পেন জাতীয় দলের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থনের এটিই ছিল সবচেয়ে বড় প্রকাশ৷’ ৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নাগরিক আহমেদ আল বোজম বলেন— ‘আমি শতভাগ স্পেনের পক্ষে৷ কারণ যুদ্ধের মাঠে তারা ফিলিস্তিনের পাশে বীরের মতো দাঁড়িয়েছে৷’ গাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের অবদমিত হৃদয়ে আজ একটাই সুর— ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে স্পেনের জয় হোক৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *