দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

১০৫ মিনিট ধরে স্পেনের আক্রমণভাগের একের পর এক তরঙ্গ এসে আছড়ে পড়ছিল আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে৷ কখনও উদীয়মান তারকা লামিন ইয়ামালের জাদুকরী পায়ে, কখনও দানি ওলমোর দূরপাল্লার রকেট শটে, আবার কখনও ফেরান তোরেসের বুলেট হেডে৷ একের পর এক অল-আউট আক্রমণ, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা৷ কারণ আর কিছু নয়, আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের সামনে অবিনাশী প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সেই একই মানুষ—এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ৷ মনে হচ্ছিল, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই মহাকাব্যিক রাতটা বুঝি তারই হয়ে থাকবে, ১০ জনের দল নিয়েও টাইব্রেকারের চেনা ছকে দলকে অলৌকিক জয় এনে দেবেন লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা৷ কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালের ট্রফি তো মাত্র একটি নিখুঁত মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকে! অবশেষে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে এলো সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত, আর তাতেই আর্জেন্টাইনদের কাঁদিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজা হিসেবে স্পেনের সোনালি প্রভাত শুরু হলো৷

তোরেসের মুক্তি ও স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বজয়: ম্যাচের ১০৬ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে পেদ্রো পোরোর শূন্যে উড়ানো নিখুঁত ক্রস৷ দূরের পোস্টে স্প্যানিশ উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসের অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি ও হেডে ডিফেন্স পেছনে ফেলে বক্সের একদম ফাঁকা জায়গায় বল নামিয়ে দেওয়া৷ আর তারপরই বার্সেলোনা তারকা ফেরান তোরেসের ডান পায়ের এক নির্মম ও বুলেটগতির শট! মুহূর্তের মধ্যে বল আশ্রয় নিল আর্জেন্টিনার অর্ধে নিথর জালে৷ এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এবারও সর্বোচ্চ শরীর মেলে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু এই ফিনিশিং শট থামানোর ক্ষমতা হয়তো পৃথিবীর কোনো গোলরক্ষকের ছিল না৷ আর সেই একমাত্র গোলেই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্নের ইতি টেনে দীর্ঘ ১৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাল স্পেন৷ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি লা রোহাদের মাথায় উঠল৷ ম্যানচেস্টার সিটি ছেড়ে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর থেকে যার ফিনিশিং দক্ষতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো রসিকতা ও মিম তৈরি হয়েছে, সেই ফেরান তোরেসের জন্য এই গোলটি ছিল কেবল ট্রফি জেতানো নয়, বরং ক্যারিয়ারের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে এক রাজকীয় মুক্তি!

রদ্রির মাস্টারক্লাস, নিষ্ক্রিয় মেসি ও এনজোর লাল কার্ড: নির্ধারিত ৯০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি ছিল একদম গোলশূন্য, তবে আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধার মোটেও সমানতালে এগোয়নি৷ ম্যাচের প্রথম বাঁশি থেকেই পুরো আধিপত্য ছিল স্প্যানিশদের দখলে৷ মাঝমাঠে বিশ্বসেরা মিডফিল্ডার রদ্রি একাই পুরো ম্যাচের ছন্দ পরিচালনা করছিলেন—কখনও তৃতীয় সেন্টারব্যাক, কখনও গভীর প্লেমেকার হিসেবে৷ প্রথমার্ধেই স্পেন প্রতিপক্ষের অর্ধে ১৭০টি সফল পাস খেলেছে, যেখানে আর্জেন্টিনার মোট পাসই ছিল মাত্র ১৯৬টি৷ সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির চরম নীরবতা৷ রদ্রির নেতৃত্বে স্পেনের সেন্ট্রাল ব্লক মেসিকে বল পেলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়নি৷ পুরো নির্ধারিত সময়ে স্কালোনির দল গোলমুখে একটিও কার্যকর শট নিতে পারেনি, এমনকি একটি কর্নারও আদায় করতে পারেনি৷

তবে আর্জেন্টিনার টানা দুই স্তরের শক্তিশালী ‘লো-ব্লক’ ডিফেন্স এবং গোলরক্ষক দিবু মার্তিনেজের পজিশনিং সেন্সের কারণে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা পায়নি স্পেন৷ কিন্তু নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার কাজ আরও কঠিন হয়ে যায়, যখন স্পেনের পাউ কুবারসিকে পেছন থেকে বেপরোয়া ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের পর লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফের্নান্দেস৷ ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালাতে থাকেন স্কালোনি৷ তবে ফুটবল দিনশেষে ফল নির্ধারণ করে একটি মাত্র মুহূর্তে৷ মেটলাইফ স্টেডিয়ামের রঙিন আলোয় সেই মুহূর্তের নাম ছিল ফেরান তোরেস, যার পায়ের জাদুতে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল স্পেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *