বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব এবং সাংগঠনিক রাজনীতি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)৷ আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে ছাত্রশিবিরের দীর্ঘ ছাত্র রাজনীতির অধ্যায় থেকে ছুটি নেওয়ার কথা নিশ্চিত করেন তিনি৷ রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে— ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চূড়ান্ত মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি ছাত্রসংগঠনটির পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন৷
মেয়র পদে নির্বাচন ও শিবিরের নিয়ম:
ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজ বিকেলে নিশ্চিত করেছেন যে— যেহেতু সাদিক কায়েম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী, সেহেতু সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে মূল দল জামায়াতে যোগ দিতে হবে৷ এ কারণে তিনি ছাত্রশিবিরের দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছেন৷ খুব দ্রুতই তিনি জামায়াতের আমিরের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলে যোগ দেবেন৷
এর আগে গত ১ মে রাজধানীর কাকরাইলে এক সেশন কাউন্সিলে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করে৷ ওই ঘোষণার পর দেশজুড়ে ব্যপক তোলপাড় শুরু হলে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন— ছাত্রশিবিরের সংবিধানে বা দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রার্থী হওয়ার কোনো সাংগঠনিক সুযোগ নেই৷ এই আইনি জটিলতা এড়াতেই আজ সংগঠনের ২০২৬ সালের ষাণ্মাসিক পুনর্গঠন (সেটআপ) প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ছুটি নেন তিনি৷ এ বিষয়ে সাদিক কায়েম জানান— ছাত্রশিবিরের দায়িত্ব শেষ করে বিদায় নেওয়ার পর যে কেউ যেকোনো মূল ধারার রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়ে জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এবং তিনি নিজেও এখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন৷
জুলাই বিপ্লবের ‘সালমান’ ও ডাকসু ভিপি:
সাদিক কায়েম ২০১৩ সালে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে প্রথম প্রকাশ্যে এসে চমক তৈরি করেন৷ ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গোপনে ‘সালমান’ ছদ্মনামে এক অসামান্য ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন৷ সে সময় তিনি আন্দোলনের সম্মুখসারির মূল সংগঠকদের নিরাপদ আশ্রয়, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়, প্রতিদিনের কর্মসূচি নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে আন্দোলনের সেনসিটিভ তথ্য পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছিলেন৷
বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ঐতিহ্যবাহী ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ব্যানারে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নির্বাচিত হন তিনি৷ ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি সাদিক কায়েম পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘হিল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করাসহ ‘স্টুডেন্টস অ্যাগেইন্সট ভায়োলেন্স এরিয়াওয়্যার’ (সেইভ) এর পরামর্শক এবং ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভ’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন৷ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন— ছাত্রশিবির থেকে সাদিক কায়েমের এই আনুষ্ঠানিক বিদায় এবং জামায়াতের ব্যানারে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র রেসে নামার ঘোষণা ঢাকার আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে এক বিশাল তরুণ ভোটার ফ্যাক্টর তৈরি করতে যাচ্ছে৷
