ডান হাতের আঙুলে চিড় নিয়েও গোলপোস্টের নিচে অনন্য ‘দিবু’ মার্তিনেজ

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে ইউরোপের পরাশক্তি স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগে নিজের ডান হাতের গুরুতর চোট ও ইনজুরি নিয়ে অবশেষে প্রকাশ্য মুখ খুলেছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত ও অবিনাশী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ৷ তিনি এক বিস্ফোরক তথ্যে জানান যে— চলতি বিশ্ব আসর বা টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে ডান হাতের অনামিকা আঙুলে চির ধরার পর থেকে এখনও প্রতিদিন মাঠে নামার সময় তীব্র ব্যথা অনুভব করেন তিনি৷ তবে দেশের জার্সিতে মাঠের লড়াই চালিয়ে যেতে চিকিৎসকদের দেওয়া দ্রুত অস্ত্রোপচারের পরামর্শ একপাশে সরিয়ে রেখে ব্যথানাশক নিয়েই খেলে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই বাজপাখি৷

চোটের ইনসাইড স্টোরি ও অবসর গুঞ্জন: হাইভোল্টেজ ফাইনালের দুই দিন আগে আয়োজিত অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে মার্টিনেজ বলেন— ‘আমার ডান হাতে এখনও প্রতিদিনই তীব্র ব্যথা থাকে৷ আমি জানতাম যে ইনজুরিটা নিয়ে খেললে এমনটাই হবে৷ টুর্নামেন্টের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের যেসব খ্যাতনামা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ করেছি, তারা সবাই অতি দ্রুত অস্ত্রোপচার বা সার্জারি করার কঠোর পরামর্শ দিয়েছিলেন৷ কিন্তু আমি দেশের স্বার্থে সেটা করিনি৷ গ্রুপ পর্বে ব্যথার কারণে ঠিকমতো অনুশীলনও করতে পারিনি৷ তবে শেষ ষোলোর নকআউট পর্বের পর থেকে আর চোটের নেতিবাচক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাইনি, এখন মানসিক ও শারীরিকভাবে অনেক ভালো অনুভব করছি৷’

দ্বিতীয়বারের মতো ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার আকস্মিক অবসরের প্রসঙ্গও ওঠে সংবাদ সম্মেলনে৷ কয়েক বছর আগে সতীর্থ নিকোলাসের সঙ্গে আলাপচারিতায় এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মার্টিনেজ৷ তবে এবার সেই গুঞ্জন সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে ৩৩ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক বলেন— ‘হ্যাঁ, তখন নিকোর সঙ্গে এএফএর অনুশীলন কেন্দ্রে আবেগতাড়িত হয়ে এমন কথা বলেছিলাম৷ কিন্তু এখন আমার একমাত্র ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনাল জেতা৷ এই দল বছরের পর বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে নিজেদের উন্নত করেছে৷ কখনও কখনও আমরা যা অর্জন করেছি, তা একা একা ভেবে বাথরুমে কেঁদে ফেলি৷ তবে ফুটবল মাঠে এখনও আমাদের আনন্দ করার মতো অনেক কিছু বাকি আছে৷’

কাতারের চেয়ে উপভোগ্য আসর ও স্পেনকে নিয়ে মূল্যায়ন: কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় উত্তর আমেরিকার মাটির এই আসর অনেক বেশি উপভোগ করছেন বলে জানান মার দেল প্লাতার এই লড়াকু সন্তান৷ তিনি বলেন— ‘সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের পর কাতারে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম৷ খুব বেশি শট মোকাবিলা করতে হয়নি, তবু গোল হজম করেছিলাম৷ পরে পেনাল্টি শুটআউটে অবদান রাখি৷ তবে এবার পায়ে বল নিয়েও আরও নিখুঁত ও আধুনিক ফুটবল খেলছি৷ রোববার মাঠে নামলে দর্শকরা গ্লাভস হাতে আমাকে হাসিমুখেই দেখতে পাবেন৷ প্রতিপক্ষ এক বা দুটি গোল করলেও পরের মুহূর্তে আমি একই আত্মবিশ্বাসী দিবু থাকি৷ চাপ আমাকে মোটেও প্রভাবিত করে না৷’

ফাইনালে প্রতিপক্ষ স্পেন ও তাদের উদীয়মান বিস্ময় বালক সম্পর্কে দিবুর মূল্যায়ন ছিল দারুণ প্রশংসাসূচক৷ তিনি বলেন— ‘স্পেন দুর্দান্ত ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল৷ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা অনেক ফুটবলারের কারণে তাদের শক্তি ও রণকৌশল সম্পর্কে আমার বেশ ভালো ধারণা আছে৷ তাদের একজন অসাধারণ ট্যাকটিশিয়ান কোচ আছেন৷ শুধু লামিনে ইয়ামাল নয়, পুরো স্প্যানিশ স্কোয়ার্ডই দারুণ শক্তিশালী৷ তারা যোগ্য হিসেবেই ফাইনালে উঠেছে৷ তাদের যেমন আক্রমণাত্মক শক্তি আছে, রক্ষণভাগে আমাদেরও তেমনই প্রতিরোধ আছে৷ আশা করি, এটি এমন একটি ম্যাচ হবে, যা বিশ্বজুড়ে দর্শকরা অনেক দিন মনে রাখবেন৷’

সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে এসে নিজের ফুটবল দর্শন ও কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মার্তিনেজ৷ গোলরক্ষকের আধুনিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন— ‘গোলরক্ষকের কাজ শুধু ভালো সেভ করা নয়, রক্ষণভাগ আগলে রেখে সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস জোগানো৷ এবার আমরা অনেক গোল করেছি এবং আগের বিশ্বকাপের তুলনায় কম গোল হজম করেছি৷ চোট পাওয়ার পর কোচ স্কালোনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন— ‘তুমি যে অবস্থাতেই থাকো, আমি তোমাকে আমার দলেই চাই৷’ আমার কাছে কোচের এই একটিমাত্র ভরসার বাণী ১০টি পেনাল্টি ঠেকানো বা পত্রিকার প্রধান শিরোনামে ওঠার চেয়েও কোটি গুণ বড় প্রাপ্তি৷ ফাইনালে যদি আমার বিশেষ কিছু করার সুযোগ নাও আসে, তবু দল জিতলে সেটাই হবে আমার জীবনের সেরা আনন্দ৷’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *