ফ্রন্টলাইনের বাইরে ইউক্রেনীয় ‘ভিডমা’ বা ডাইনিদের ছদ্মবেশী প্রতিরোধ; কাঁপছে রুশ বাহিনী

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু গোলাবারুদ আর সম্মুখ সমরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এই যুদ্ধ এখন ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং অত্যন্ত গোপনীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্কেও৷ মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত চোরাগোপ্তা প্রতিরোধ আন্দোলনে ভিন্ন এক মাস্টারমাইন্ড ভূমিকা পালন করছেন বহু নারী৷ স্থানীয়ভাবে এই নারীদের বলা হচ্ছে ‘ভিডমা’ বা ‘ডাইনি’৷

ইউক্রেনীয় লোককাহিনিতে মূলত ‘ভিডমা’ বলতে এমন নারীদের বোঝানো হয়, যাঁরা অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও অজ্ঞাত কোনো বিশেষ জ্ঞান এবং দক্ষতার অধিকারী৷ বর্তমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এই রহস্যময় শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে সেইসব সাহসী নারী প্রতিরোধকর্মীদের বোঝাতে, যাঁরা রুশ অধিকৃত এলাকায় থেকে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে অত্যন্ত সুকৌশলে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীকে নিখুঁত হামলার রসদ জোগাচ্ছেন৷

প্রেমের ফাঁদ ও অস্তিত্বহীন নারী: ‘দ্য আটলান্টিক’-এর প্রতিবেদনে অবরুদ্ধ ইউক্রেনে থাকা এক রুশ সেনার অবিশ্বাস্য ও মারাত্মক এক ফাঁদে পড়ার ঘটনা নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে৷ ফ্রন্টলাইনে থাকা ওই রুশ সেনা মাসের পর মাস ধরে ভাবতেন, এক আকর্ষণী ইউক্রেনীয় গৃহবধূর সাথে তাঁর গভীর ও রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে৷ ওই নারী একা থাকেন এবং ফ্রন্টলাইনে সেনার জীবন কেমন কাটে তা নিয়ে ভীষণ কৌতূহল দেখাতেন৷ পুরোনো প্রেমিক-প্রেমিকার মতো তাঁরা প্রতিদিনের ছোটখাটো সুখ-দুঃখের গল্প শেয়ার করতেন৷

একদিন সেই দূরবর্তী নারী যখন দেখতে চাইলেন যে ওই সেনা আসলে ঠিক কোথায় দায়িত্বরত আছেন, তখন সরল বিশ্বাসে ওই রুশ সেনা ক্যাম্পের একটি ছবি পাঠান৷ সেই ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব আবছাভাবে তাঁদের গোপন সেনা ক্যাম্পের একটি মানচিত্র দেখা যাচ্ছিল৷ ব্যস, সেই মানচিত্রের সূত্র ধরেই সেকেন্ডের মধ্যে শনাক্ত করা হয় রুশ ঘাঁটির নিখুঁত কো-অর্ডিনেট বা অবস্থান৷ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই স্থানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন ধেয়ে আসে এবং পুরো ঘাঁটিটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়৷

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, বাস্তবে সেই রূপসী নারীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না! অ্যাকাউন্টটি মূলত ব্যাকগ্রাউন্ডে বসে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঝানু পুরুষ কর্মকর্তা৷

বদলে যাওয়া প্রতিরোধ কৌশল: প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের দীর্ঘ চার বছরে ইউক্রেনের প্রতিরোধ কৌশলও সম্পূর্ণ বদলে গেছে৷ এখন মাঠপর্যায়ের ছোট ছোট ডিজিটাল ডেটা ও তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সুনির্দিষ্ট অবস্থানে রূপান্তর করা হচ্ছে৷ সাবেক ইউক্রেনীয় সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস দ্য আটলান্টিককে বলেন, “ইউক্রেনীয় সমাজে ভিডমাদের জ্ঞান ও দক্ষতার জন্য সম্মান করা হয়৷ বর্তমানে এই নারীরা রুশ চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে হাসপাতাল, স্কুল কিংবা বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কাজ করতে করতে রুশ সেনাদের মুভমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছেন৷”

মারিউপোল থেকে কৌশলে পালিয়ে যাওয়া এবং বর্তমানে শহরটির একটি আন্ডারগ্রাউন্ড প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী পেত্রো আন্দ্রিউশচেঙ্কো বলেন, নারীরা সমাজের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গায় অনায়াসে যেতে পারেন, যেখানে পুরুষদের পক্ষে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়৷ ফলে প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত ক্রুশিয়াল৷

প্রতিবেদনে ‘রোকসানা’ ছদ্মনামে পরিচিত এক নারীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে৷ খেরসনের একটি ক্লিনিকে কর্মরত এই নারী রুশ আগ্রাসনের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হন৷ বর্তমানে তিনি বিদেশে সুরক্ষিত অবস্থায় বসবাস করলেও ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার জন্য লাইভ লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের কাজ করছেন৷ স্থানীয় এলাকার রাস্তা, গুদামঘর ও রুশ স্থাপনাগুলো সম্পর্কে তাঁর নিখুঁত ভৌগোলিক জ্ঞান ড্রোন হামলার আগে টার্গেট নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ রোকসানা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “গুদামঘর আবার তৈরি করা যায়, কিন্তু রাশিয়ানরা নিহত হলে তাদের আর ফিরিয়ে আনা যায় না৷”

১৫ মিনিটেই টার্গেট ধ্বংস: ইউক্রেনিয়ান উইমেনস গার্ডের প্রধান ওলেনা বিলেতস্কা জানান, ২০১৪ সাল থেকে তাঁর এই সংগঠনটি প্রায় ৬০ হাজারের বেশি নারীকে আত্মরক্ষা, বেঁচে থাকা এবং আধুনিক প্রতিরোধ কৌশলের বিশেষ ও কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়েছে৷ তাঁদের অনেকেই বর্তমানে রুশ অধিকৃত অঞ্চলে থেকে বিভিন্ন ছদ্মনামে প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত রয়েছেন৷

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অধিকৃত অঞ্চল থেকে পাওয়া এসব ইন্টেলিজেন্স তথ্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনের ৪২৬তম আনম্যানড সিস্টেমস রেজিমেন্টের বিশেষ ড্রোন ইউনিট নিয়মিত নিখুঁত অপারেশন পরিচালনা করে৷ কোনো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর কখনও কখনও মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই সেখানে ড্রোন হামলা চালানো সম্ভব হয়৷ এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে হামলার সময়ও গোয়েন্দা কর্মীরা অনলাইনে সংশ্লিষ্ট রুশ সেনার সঙ্গে রোমান্টিক কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে৷

মারিউপোলে সক্রিয় এক প্রতিরোধকর্মী, যিনি ‘সেস্ত্রা’ (বোন) নামে পরিচিত, তিনি বলেন, “আমি চাই রুশ সেনারা সব সময় গভীর সন্দেহ ও মরণভয়ের মধ্যে থাকুক এবং চারপাশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের মধ্যেই সম্ভাব্য মৃত্যুদূত দেখতে বাধ্য হোক৷” অন্যদিকে সাবেক বৈপ্লবিক এমপি লেসিয়া ওরোবেটস বলেন, বিদেশ সফরে প্রায়ই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়—ইউক্রেনের পুরুষরা যদি শেষ হয়ে যায়, তখন কী হবে? তাঁর ক্ষুরধার জবাব, “সাবধান, এমনটা চাইবেন না৷ ইউক্রেনের নারীরা যদি পূর্ণ নেতৃত্ব হাতে নেয়, তাহলে ফ্রন্টলাইনে কোনো রাশিয়ানই আর বেঁচে ফিরতে পারবে না৷”

তবে যুদ্ধকালীন মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির কারণে উভয় পক্ষের বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবির স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই সব সময় সম্ভব হয় না বলে প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করা হয়েছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *