বিদায়ি ভাষণে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

টানা ১৮ মাস অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পর নবনির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টা ১৫ মিনিটে দেওয়া এ ভাষণে তিনি গত দেড় বছরের অর্জন, চ্যালেঞ্জ, সংস্কার, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

তিনি ১৭ বছর পর একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং জুলাই সনদের গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান। পাশাপাশি অভ্যুত্থান-পরবর্তী কঠিন বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র

ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জয়ী ও পরাজিত উভয় প্রার্থীকেই অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, হার-জিত গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের অংশ।

তিনি উল্লেখ করেন, জয়ীরা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন, আর পরাজিতরাও প্রায় অর্ধেক ভোটারের সমর্থন পেয়েছেন—যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের প্রমাণ।

শুরুর চ্যালেঞ্জ

দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশকে সচল করা বলে জানান তিনি। প্রশাসনের ভেতরে আস্থার সংকট, পলাতক কর্মকর্তারা এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল কঠিন কাজ।

সংস্কার, বিচার ও জুলাই সনদ

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি মূল অঙ্গীকার ছিল—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার অধিকাংশই বাস্তবায়িত।

জুলাই সনদকে তিনি সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে স্বৈরাচারের পুনরাবৃত্তির পথ বন্ধ হবে।

পুলিশ ও বিচার বিভাগ

তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব করতে নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বেআইনি আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সেপারেশন অব জুডিশিয়ারি কার্যকর করা এবং গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

নারী ও শিশু সুরক্ষা

নারী ও শিশু সুরক্ষায় যৌন হয়রানি ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন সংশোধন ও নতুন বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ফ্যাসিবাদের বিচার

গত ১৬ বছরের দমন-পীড়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতির বিচার শুরু হয়েছে এবং একাধিক ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার

দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার ও ঋণের বোঝা ছিল। তবে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমেছে।

শ্রমিক অধিকার ও ব্লু ইকোনমি

শ্রম আইন সংস্কার ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসমর্থনের পাশাপাশি গভীর সমুদ্র বন্দর ও মৎস্য খাতে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্রনীতি ও রোহিঙ্গা সংকট

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনী ও তরুণ সমাজ

সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও জনশক্তি রপ্তানির ওপর জোর দেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তির ফলে রপ্তানি খাতে সুবিধা বাড়বে বলে জানান তিনি। জাপান ও চীনের সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন।

শিক্ষা ও সততা

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নিয়ম মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

বিদায়ের আগে তিনি জানান, গণভবনকে ‘জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বৈরাচারের ইতিহাস জানতে পারে।

শেষে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব সবার—দলমত নির্বিশেষে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *