ভোটের মাঠে প্রচারণা শুরু, সহিংসতা ঠেকাতে জিরো টলারেন্সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আজ থেকে সারাদেশে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পরপরই প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ, পথসভা ও গণসংযোগে নেমে পড়লেও একই সঙ্গে নির্বাচনী পরিবেশ ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রচারণার প্রথম দিনেই লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জ এলাকায় ফেস্টুন লাগানোকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় দলের চারজন আহত হন। আহতদের লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এর আগেও প্রচারণা শুরুর আগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন আহত হন। এছাড়া সোমবার চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় র‌্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত এবং আরও তিনজন গুরুতর আহত হন। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও লক্ষ্মীপুর সদর এলাকাতেও দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। জানা গেছে, ভোটকালীন দায়িত্ব পালনে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি বিজিবি, র‌্যাব, সশস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসও নির্বাচনী নিরাপত্তায় যুক্ত থাকবে। নজরদারির অংশ হিসেবে ড্রোন ও বডি ওর্ন ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল, চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ঘটনায় জড়িতদের তাৎক্ষণিকভাবে আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। পাশাপাশি জামিনে মুক্ত দাগি অপরাধীদের ওপর বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও টার্গেটেড হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে। তবে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করছে।

তিনি আরও জানান, যে কোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও এলাকাগুলোর ওপর নিবিড় নজর রাখছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

এদিকে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *