দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক অচলায়তন ও একতরফা নির্বাচনের সংস্কৃতি ভেঙে বাংলাদেশ অবশেষে একটি সত্যিকারের কার্যকর, প্রাণবন্ত এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক জাতীয় সংসদ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম৷ তিনি বলেন, এবারের অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা সংসদে এসেছেন৷
আজ বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের সাংবাদিক লাউঞ্জে বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজেএ) আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘ফল উৎসব’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার এই ঐতিহাসিক ও ক্ষুরধার মন্তব্য করেন৷ স্পিকার এ সময় গণমাধ্যমের বলিষ্ঠ ও স্বাধীন ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ লেখনীর মাধ্যমেই জাতীয় সংসদ আরও বেশি মহিমান্বিত হবে এবং এই পবিত্র সংসদের প্রতি দেশের সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের হারানো আস্থা ও বিশ্বাস পুনরুত্থিত হবে৷
অতীতের সংসদ নিয়ে স্পিকারের অকপট স্বীকারোক্তি: অনুষ্ঠানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন মেয়াদে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক নজিরবিহীন অকপট সত্য তুলে ধরেন৷ তিনি বলেন, “আমি আমার জীবনে বেশ কয়েকটি সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি৷ সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলের সংসদের সদস্যও ছিলাম আমি; কিন্তু সে কথা জনসমক্ষে বলতে আজও আমার নিজের কাছে ভীষণ লজ্জা লাগে৷ তখন আমরা টেলিভিশন ও রেডিওতে শুনতাম অমুক ব্যক্তি নির্বাচনে বিজয়ী বা নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু দুদিন পর বাস্তবে সংসদে এসে দেখতাম অন্য একজন ব্যক্তি বসে আছেন৷ সেই সময় নানা অনিয়ম এবং প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেকেই আমরা সংসদ সদস্য হয়ে গিয়েছিলাম৷”
তিনি আরও যোগ করেন, “দীর্ঘদিন ধরে দেশে এমন পাতানো ও অকার্যকর সংসদ দেখার পর এবার আমরা অবশেষে একটি প্রকৃত ও স্বাধীন সংসদ পেয়েছি৷ এর আগে ১৯৯১ সালে আমি ঠিক এমনই একটি চমৎকার ও প্রাণবন্ত সংসদ দেখেছিলাম, আর এখনকার ত্রয়োদশ সংসদও হুবহু তেমনটাই হয়েছে৷ যেহেতু সাধারণ মানুষ দেশের আমূল পরিবর্তন দেখতে চায়, তাই এবার প্রত্যেকেই নিজ যোগ্যতা, সততা ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন৷ জনগণের প্রকৃত সেবা করাই এখন আমাদের এই সংসদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব৷”
সংসদকে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু করার তাগিদ: অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্রীয় সকল নীতি নির্ধারণী কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷ দেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কলমযোদ্ধা সাংবাদিকদের গঠনমূলক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ এ ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ আয়োজন সাংবাদিক ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক পেশাদার যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বহুগুণ বৃদ্ধি করে৷”
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ফল উৎসবের মতো এই আয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে৷ সংসদকে সাধারণ জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাংবাদিকদের যেকোনো ধরনের ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ঠ উদ্যোগে সংসদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে৷
দলমতের ঊর্ধ্বে সংসদীয় মেলবন্ধন: বিপিজেএ সভাপতি হারুন জামিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খান লিথো৷ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন— সরকারদলীয় হুইপ জি কে গউছ, মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) এবং বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম৷
এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদের সরকারি দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত সংসদ সদস্যবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া এবং সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) সৈয়দ আবদাল আহমেদসহ দেশের জ্যেষ্ঠ ও শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক নেতারা এই ফল উৎসবে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক ও সংসদীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন৷
