বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের একটি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষস্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে এক ভয়াবহ ও দুর্ধর্ষ সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে৷ হামলার ঠিক দুই দিন আগে প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে৷ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী কর্তৃপক্ষের৷ এই নজিরবিহীন ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নগরের চকবাজার থানায় ইতিমধ্যেই একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে৷
দুর্ধর্ষ হামলার বিবরণ ও ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি: আজ সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ১২টা ৩০ মিনিটের মধ্যে মাত্র ১৫ মিনিটের তাণ্ডবে নগরের চকবাজার থানার ১২১ মনুমিয়াজী লেইন, চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস রোডের ‘মরিয়ম হাইটস’ ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত এক্সাবাইট লিমিটেড এবং ডিডিএন (DDN) কার্যালয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে৷ ডিডিএনের ম্যানেজার (অ্যাকাউন্টস) মো. শামশুদ্দোহা মিনহাজ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় এই অভিযোগ দায়ের করেন৷
অভিযোগে বলা হয়েছে— চাঁদার দাবি প্রত্যাখ্যান করার দুই দিন পর আজ সোমবার দুপুরে হঠাৎ করেই ৩০ থেকে ৪০ জন ধারালো রামদা, কিরিচ, চাইনিজ কুড়ালসহ দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এবং মুখে মুখোশ পরে অফিসে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়৷ সন্ত্রাসীরা মুহূর্তের মধ্যে অফিসের ভেতরের কাচের দরজা, নান্দনিক আসবাবপত্র, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিনসহ সমস্ত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম পিটিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়৷ এতে অফিসের প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়৷ ভাঙচুরের শিকার সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে এইচপির ৬টি, ডেলের ৩টি ও এসারের ১টি ডেস্কটপ কম্পিউটার, ডেলের ৩টি ও থিংকপ্যাডের ১টি দামি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস৷
বেতনের ৩৫ লাখ টাকা লুট ও ‘ডেভিড ইমন’ কানেকশন: চকবাজার থানার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজে দেখা গেছে— হামলাকারীরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় অফিসের ড্রয়ার ও আলমারি ভেঙে নগদ ৪৭ হাজার টাকা, ৩টি দামি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের ব্যাগে রক্ষিত কর্মচারীদের চলতি মাসের বেতন বাবদ নগদ ৩৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে বীরদর্পে পালিয়ে যায়৷ ঘটনার পর পরই মুখোশধারী হামলাকারীদের অস্ত্র হাতে অফিসে তাণ্ডব চালানোর এই শিউরে ওঠা সিসিটিভি ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয়৷
ডিডিএনের পরিচালক রিদোয়ানুল কবির ও স্বত্বাধিকারী আদিল বিন মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন— গত ১১ জুলাই আদিল বিন মামুনের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একটি বিদেশি ও একটি দেশীয় নম্বর থেকে কল আসে৷ কলকারী নিজেকে বিদেশে অবস্থানরত কুখ্যাত পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর প্রধান অনুসারী ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে বলেন, চট্টগ্রামে ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে; অন্যথায় পুরো ব্যবসা তারা নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং প্রাণহানি ঘটাবে৷ চাঁদা না দেওয়ায় এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে৷
পুলিশের তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ: এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন আজ সন্ধ্যায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন— ‘ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশের একটি চৌকস টিম দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আলামত সংগ্রহ করেছে৷ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজ ও লিখিত অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে৷ চট্টগ্রামের বুকে এমন চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজি বরদাশত করা হবে না; জড়িতদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় সমস্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে৷’
