দেশে নতুন নির্বাচিত সরকার আসার পরও ভয়ের সংস্কৃতি চালু হওয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের সাথে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ৷ তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন— ‘দেশ যদি আবারও কোনো নতুন ফ্যাসিবাদের থাবায় পড়ে, তবে খাঁটি বাংলাদেশপন্থিরা আবারও বুক চিতিয়ে রাজপথে নেমে আসবে৷ দেশে আজ আইনের শাসন পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে৷’ গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সিরাজদিখানের নিমতলায় ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এক বিশাল পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন৷
শহীদের রক্ত ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরম ব্যর্থতার খতিয়ান: ক্ষমতাসীন দল বিএনপির তীব্র সমালোচনা করে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন— ‘যে জমিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ বীর শহীদ হয়েছেন এবং ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ আজীবনের জন্য আহত ও পঙ্গু হয়েছেন, তাদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে বর্তমান সরকার ও ক্ষমতাশীন দল চরম প্রতারণা করছে৷ আপনারা জনগণের সঙ্গে আর বেঈমানি করবেন না৷ আমরা স্পষ্ট দেখতে পারছি— দেশের সাধারণ মানুষ আজ প্রতারিত হচ্ছে, পুলিশ প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের সর্বত্র নগ্ন দলীয়করণ করা হচ্ছে৷’
এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সরাসরি কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেন— ‘জনগণ ও ছাত্ররা বুক পেতে রাস্তায় না নামলে আপনাকে কিন্তু আজীবন ভারতের শিলংয়ের রেস্ট হাউজেই পড়ে থাকতে হতো, তারেক রহমানকে লন্ডনে নির্বাসনে থাকতে হতো এবং বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীদের দেশের বিভিন্ন জেলে আর ধানক্ষেতে রাত্রীযাপন করতে হতো৷ অথচ আজ ক্ষমতায় এসে আপনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক করে তুলেছেন৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ একজন চরম ব্যর্থ মন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন৷ নির্বাচনের আগে সরকার বলেছিল ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, কিন্তু কর্মসংস্থান না করে তারা বেকার যুবকদের হাতে উল্টো মাদক তুলে দিচ্ছে৷’
রাষ্ট্র সংস্কার ও তারেক রহমানের ভুল পথ: রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে সুর চড়িয়ে এই তেজস্বী সাংসদ বলেন— ‘দেশের ৭০ ভাগ জনগণ পরিষ্কারভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় ও ভোট দিয়েছেন৷ অথচ বিএনপি সরকার এখন ঢাল হিসেবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে৷ সংবিধানের অর্ধেক মানব আর অর্ধেক মানব না; অর্থাৎ যেটা নিজেদের ক্ষমতার পক্ষে যাবে সেটা মানব, আর যেটা যাবে না সেটা মানব না— এই দ্বিমুখী নীতি রাজপথে আর চলতে দেওয়া হতে পারে না৷’
ভারতে পালিয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে আসার গুঞ্জন প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহ তীব্র উপহাস করে বলেন— ‘ডিসেম্বরের নাটক কেন, ক্ষমতা থাকলে এখনই দেশে আসেন৷ যে আন্দোলনের মুখে নিজের লাখো নেতাকর্মীদের চরম বিপদে ফেলে রেখে নিজের আপন আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে রাতের অন্ধকারে বিমানে পালিয়ে যায়, সে আর কোনোদিন বাংলাদেশে আসতে সাহস পাবে না৷ যার পরিবারের সব সদস্য বিদেশি হয়ে আরাম-আয়েশে আছে, তারা দেশে এসে জয় বাংলা শ্লোগান দিক, জনগণ জবাব দেবে৷’
একই সাথে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সতর্ক করে তিনি বলেন— ‘নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নবগঠিত মন্ত্রিসভার কতিপয় সুবিধাবাদী সদস্যরা তাঁকে সম্পূর্ণ ভুল পথে পরিচালিত করছেন৷ আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছি, সময় থাকতে সোজা না হলে তারেক রহমানের চূড়ান্ত অবস্থাও কিন্তু কৃষ্ণনগরের মতো করুণ হবে৷’
মুন্সীগঞ্জ জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মাজিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশাল পথসভায় আরও বক্তব্য রাখেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দার, জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম এবং সিরাজদিখান উপজেলা প্রধান সমন্বয়ক আলী নেওয়াজ উজ্জ্বলসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ৷ এনসিপি জেলা কমিটির সদস্য সচিব মারুফ হাসান মন্টির অত্যন্ত সাবলীল সঞ্চালনায় পথসভার শেষ ভাগে আলী নেওয়াজ উজ্জ্বলকে আগামী সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাচনে এনসিপির আনুষ্ঠানিক একক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে উপস্থিত হাজারো জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ৷
