ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় পিএসজি-র; ফ্রান্সে ভয়াবহ ফুটবল দাঙ্গায় গ্রেপ্তার চার শতাধিক

ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও একবার শক্ত করে পাকা করল প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত এক চরম স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনালকে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা ঘরে তুলেছে ফরাসি ক্লাবটি। তবে মাঠের এই অতিমানবিক ও ঐতিহাসিক জয় উদযাপনের পরপরই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহর কার্যত এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ফুটবল সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের জেরে দেশজুড়ে চার শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফাইনালে নির্ধারিত সময়ের খেলায় আর্সেনালের সাথে ১-১ গোলে ড্র করার পর, পেনাল্টি শুটআউটে ৪-৩ ব্যবধানে জয় পায় পিএসজি। এর ঠিক ১২ মাস আগে মিউনিখে ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পিএসজি। এই জয়ের মাধ্যমে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ৭১ বছরের ইতিহাসে পিএসজি মাত্র ১০ম ক্লাব হিসেবে টানা দুইবার শিরোপা জয়ের অনন্য স্বাদ পেল।

একই সাথে ১৯৯৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যুগ শুরু হওয়ার পর ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের টানা তিনবার শিরোপা জেতার পর প্রথম দল হিসেবে পিএসজি সফলভাবে নিজেদের মুকুট ধরে রাখতে সক্ষম হলো। টানা দুই বছর ধরে কোচ লুইস এনরিকের দল তাদের অংশ নেওয়া প্রায় প্রতিটি প্রতিযোগিতায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। গত মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সম্ভাব্য ১০টি ট্রফির মধ্যে ৮টিই জিতেছে তারা।

খেলা শেষে পিএসজি বস লুইস এনরিকে বলেন, “আমার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। উত্তেজনা, ক্লান্তি সবকিছু একসাথে কাজ করছে। তবে এটাই মৌসুমের সেরা মুহূর্ত। আমরা এখনও চ্যাম্পিয়ন, টানা দুইবার, এটা সত্যিই অসাধারণ।”

ফরাসি ক্লাবটি পেনাল্টি শুটআউটে জয়ী হওয়ার পরপরই রাজধানী প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী শঁজেলিজ-এ হাজার হাজার উগ্র সমর্থক জড়ো হন। এর আগে দিনের শুরুতে, পিএসজির হোম গ্রাউন্ড পার্ক দে প্রাঁস-এ বড় পর্দায় ফাইনাল খেলা দেখতে আসা সমর্থকদের সাথে পুলিশের প্রথম দফায় সংঘর্ষ হয়।

পিএসজির জয়ের পর ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে অবাধে নিষিদ্ধ আতশবাজি ও ফ্লেয়ার জ্বালানো শুরু হয়। প্যারিস থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাস্তায় ইলেকট্রিক বাইক জ্বলছে এবং আনন্দ উল্লাসকারীরা অন্তত একটি দোকানের সামনের কাচ ভেঙে ভেতরে লুটপাটের চেষ্টা করছে। রাজধানী প্যারিসে বাস, ট্রেন ও রেলসেবা ব্যাহত করা এই উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরবর্তীতে হাজার হাজার অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ সদস্য মোাতেয়েন করা হয়েছিল।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববারের এই সহিংসতায় দেশজুড়ে মোট ৪১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৮০ জনকেই কেবল প্যারিস থেকে আটক করা হয়। প্যারিসের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা নুনিয়াজ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অন্তত সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। এই পুরো বিশৃঙ্খলাকে তিনি ‘সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই অশান্তির সময় ছয়টি দূরপাল্লার যানবাহন, দুটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি যাত্রীবাহী বাস শেল্টার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফুটবলকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে এটি টানা দ্বিতীয় বছরের চরম সহিংসতা। এর আগে গত বছর পিএসজির ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের আনন্দও সংঘর্ষের কারণে ম্লান হয়ে গিয়েছিল, যেখানে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরসহ দুইজনের করুণ মৃত্যু হয়েছিল।

ফুটবল জয়কে কেন্দ্র করে এই ভয়াবহ দাঙ্গার পর ফরাসি কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিক ও বিরোধী নেত্রী মারিন লে পেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, “কেবল ফ্রান্সেই একটি ফুটবল ক্লাবের জয় এমন ভয়াবহ দাঙ্গার জন্ম দিতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “কেবল ফ্রান্সেই সবাইকে নিজের ক্লাবের বিজয়ের সন্ধ্যায় সহিংসতা এড়াতে ঘরের মধ্যে নিজেদের বন্দি রাখতে বাধ্য হতে হয়।”

তবে এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই আজ বিকেলে পিএসজি খেলোয়াড়দের একটি বিশাল বিজয় শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে, যার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী আইফেল টাওয়ারের পাশে চম্প দে মার্স – এ ট্রফি প্রদর্শন এবং পরবর্তীতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দেওয়া একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *