‘আমি শুধু লাশ কেটেছি, ধর্ষণ করেছে ডলার!’— আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে পল্লবীর রামিসা হত্যার প্রধান আসামি সোহেলের নতুন দাবি

রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শুরুর প্রথম দিনেই আদালত কক্ষে তৈরি হয়েছে চরম নাটকীয়তা ও চাঞ্চল্য। সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে চিৎকার করে দাবি করে, “আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি; ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন।”

আজ সোমবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত শুনানি শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট গঠনের আদেশ দিয়েছেন এবং আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল পৌনে আটটার দিকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রিজন ভ্যানে করে দুই আসামিকে আদালতে আনা হয়। প্রথমে সোহেল রানাকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকে নারী হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা ১১টার দিকে শুনানির জন্য তাদেরকে এজলাসে তোলার সময় মূল ঘাতক সোহেল রানাকে বিশেষ নিরাপত্তাজনিত কারণে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং মাথায় হেলমেট পরিয়ে কাঠগড়ায় তোলা হয়।

এর পরপরই তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় আনা হলে সে তীব্র আতঙ্কে ও গরমে প্রচণ্ড হাঁপাতে থাকে। পরে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তার জ্যাকেট ও হেলমেট খুলে মুখে পানি ঢালেন। এ সময় এজলাসের ভেতরেই বারবার তাকে জ্ঞান হারাতে দেখা যায়। বেলা ১১টা ৯ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসার পর শুনানি শুরু হয়।

শুনানিতে এই মামলা পরিচালনার জন্য বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ গঠন করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ আসামিদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন।

পরে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় আসামি সোহেল রানা কথা বলতে চাইলেও তাকে সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করলে আদালত অভিযোগ গঠনের চূড়ান্ত আদেশ দিয়ে বেলা ১১টা ২৯ মিনিটে এজলাস ত্যাগ করেন।

বিচারক এজলাস ত্যাগ করার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল ও স্বপ্না একে অপরের সাথে কথা বলে। এ সময় স্বপ্নাকে সান্ত্বনা দিয়ে সোহেল বলে, “চিন্তা করো না, তোমার কোনো দোষ নেই বলে আমি জবানবন্দি দিয়েছি।” বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্নাকে সরিয়ে নেওয়ার সময় সে স্বামী সোহেল রানার দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সোহেলও তাকে অভয় দেয়।

এরপর কাঠগড়ায় একা দাঁড়িয়ে থাকা সোহেল রানা উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে হঠাৎ চিৎকার করে বলতে থাকে, “আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।” সোহেল আরও চাঞ্চল্যকর দাবি করে বলে, “মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল।” এই কথা বলার পরপরই উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন এবং বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটে তাকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রধান আসামির এই আকস্মিক ও নতুন দাবির বিষয়ে বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন এবং আগামীকাল থেকেই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। তবে পুলিশের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনে বা চার্জশিটে ‘ডলার’ নামে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ নেই। আসামি যদি এখন আইনি ফাঁকফোকর খুঁজতে এমন কিছু দাবি করে থাকে, তবে তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া বা সাক্ষ্যপ্রমাণে উঠে আসতে পারে। এটা সম্পূর্ণ ‘ম্যাটার অব ট্রায়াল’ (বিচারের বিষয়)।” তবে রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত দ্রুত সময়ে এই মামলা নিষ্পত্তি এবং আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা (মৃত্যুদণ্ড) হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

মামলার নথি ও আসামির আগের জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, নিহত শিশু রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে ফুসলিয়ে নিজেদের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল, যার ফলে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এর মধ্যে রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকলে ধরা পড়ার ভয়ে সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে।

মরদেহ গুম করার জন্য সে একটি ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে গলা থেকে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহটি খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। এছাড়া ছুরি দিয়ে তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে উপস্থিত ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে মূল ঘাতক সোহেল পালিয়ে যায়। রামিসার মা-বাবা ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে মেঝের ওপর রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুমের একটি বড় বালতির ভেতর কাটা মাথা উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ এসে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০ মে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাদকাসক্ত সোহেল স্বীকার করেছিল যে, ঘটনার আগে সে তীব্র মাত্রায় ইয়াবা সেবন করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *