বিশ্ব সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) শীর্ষ সম্মেলনে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় কূটনৈতিক উপহার আদান-প্রদানের ঘটনা ঘটেছে৷ তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে একটি সম্পূর্ণ কার্যক্ষম ব্যক্তিগতকৃত রিভলভার এবং তাজা গুলি উপহার দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান৷ আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি’ (BBC)-এর এক বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ তবে উপহারটি যেমন চমকপ্রদ, এটি নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে সমানভাবে৷

নাম খোদাই করা পিস্তল ও ব্রিটিশ আইনের রানিং মারপ্যাঁচ: বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী— তুরস্কের ডিফেন্স অ্যান্ড স্টেট ক্রাফটের তৈরি ওই রিভলভারটির বডিতে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের নাম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খোদাই করা ছিল৷ মূলত আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি সদস্য দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকেই একই ধরনের বিশেষ স্মারক আগ্নেয়াস্ত্র উপহার দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান৷

কিন্তু বিপত্তি বেধেছে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ কঠোর আইন নিয়ে৷ যুক্তরাজ্যের অত্যন্ত কড়া ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘অস্ত্র আইন’ (UK Weapon Law) অনুযায়ী— কোনো ধরনের সম্পূর্ণ সচল বা কার্যক্ষম আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও তাজা গোলাবারুদ বিনা অনুমতিতে দেশে বা রাজপ্রাসাদে আনা সম্পূর্ণ অবৈধ৷ দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও আইনের এই ধারা থেকে স্যার কিয়ার স্টারমার মুক্ত নন৷ আর এই আইনি জটিলতার কারণেই এরদোয়ানের দেওয়া উপহারের রিভলভার ও তাজা গুলিটি প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তাঁর বিশেষ বিমানে করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যেতে পারেননি৷ বর্তমানে এই বিশেষ স্মারক উপহারটি তুরস্কে নিযুক্ত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নিরাপদ হেফাজতে ও কঠোর নজরদারিতে রানিং রাখা হয়েছে৷

অস্ত্র নিষ্ক্রিয়করণ ও এরদোয়ান-স্টারমার বিশেষ চুক্তি: লন্ডনের কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে— তুর্কি উপহারের এই আকর্ষণীয় পিস্তলটি যুক্তরাজ্যে পাঠানোর আগে সেটিকে সম্পূর্ণ ডিকমিশন বা নিষ্ক্রিয় (Decommission) করা হবে, যাতে করে যান্ত্রিকভাবে সেটি আর কোনোভাবেই তাজা গুলি ছোড়ার সক্ষমতায় না থাকে৷ এই বিশেষ সামরিক উপহারটি বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান নিজে বিশেষ কূটনৈতিক অনুমতি দিলেও যুক্তরাজ্যের আইনকে সম্মান জানিয়ে সেটি আপাতত তুরস্কেই রাখা হয়েছে এবং নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া রানিং চলছে৷

এদিকে এই চমকপ্রদ উপহারের পাশাপাশি ন্যাটো সম্মেলনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন৷ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন এবং রানিং ভূ-রাজনীতির গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও বেশি জোরদার করতে একটি যুগান্তকারী ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি’ (Defense Cooperation Agreement) স্বাক্ষর করেন দুই নেতা৷

সম্মেলন শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন— “এটি সামগ্রিকভাবে একটি অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ সম্মেলন ছিল৷ ন্যাটোর মাধ্যমে আমরা বিশ্বমঞ্চে যে শক্তিশালী ঐক্য প্রদর্শন করতে চেয়েছিলাম, তা পুরোপুরি অর্জন করতে পেরেছি৷ বিশেষ করে বর্তমান ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং ইরানের চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই বিশ্ব ঐক্যের বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷” আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন— গত মাসে রাজনীতি থেকে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর এটিই স্যার কিয়ার স্টারমারের জীবনের শেষ বড় আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সম্মেলন হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হচ্ছে৷

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *