রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গত দুই দিন ধরে চলা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের তীব্র রাজপথ আন্দোলনের মোড় নাটকীয়ভাবে ঘুরে গেছে৷ তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের মুখে থাকা শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের মূল দাবি থেকে অবশেষে সরে এসেছে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা৷ তবে পদত্যাগের দাবি প্রত্যাহার করলেও পরীক্ষা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি আদায়ে আজ বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে সচিবালয়ে (Secretariat) প্রবেশ করেছে৷
এর আগে, পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুর থেকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, উত্তরা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করার ফলে পুরো ঢাকা থমকে গিয়েছিল, যা বিকেল গড়াতেই নতুন রূপ নেয়৷
লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা ভবনে ব্যারিকেড: আজ বুধবার নিজ নিজ পরীক্ষা শেষে পূর্বঘোষিত ‘লংমার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি সড়কে অবস্থান নেন কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী৷ এর ফলে সায়েন্স ল্যাব মোড় দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়৷ এরপর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিমুখে পদযাত্রা বা লংমার্চ শুরু করেন৷
বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকার আব্দুল গণি রোডের মুখে পৌঁছালে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিক্ষা ভবনের সামনে কাঁটাতার ও শক্তিশালী ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়৷ সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের তীব্র স্লোগান ও অবস্থানের পর বিকেল ৫টার দিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল শিক্ষা ভবন থেকে সচিবালয়ের দিকে রওনা হয় এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার জন্য ভেতরে প্রবেশ করে৷
শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি: সচিবালয়ে আলোচনার টেবিলে শিক্ষার্থীরা যে ৬টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেছে, সেগুলো হলো— ১. দুর্যোগপূর্ণ ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারেনি বা খারাপ করেছে, তারা যদি পুনরায় অংশ নিতে চায়, তবে তাদের সেই পুনঃপরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে৷ ২. যেসব শিক্ষার্থী একই বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় দেবে, তাদের ক্ষেত্রে পূর্বের সাধারণ পরীক্ষা ও পুনঃপরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যেটিতে সর্বোচ্চ নম্বর থাকবে, সেটিই চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে গণ্য করতে হবে৷ ৩. প্রশ্নপত্রে থাকা যেকোনো ধরনের ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নের জন্য সব শিক্ষার্থীকে সমভাবে পূর্ণ নম্বর প্রদান করতে হবে৷ ৪. দেশের চলমান অস্থিতিশীল ও মানসিক চাপযুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে এরপর পুনরায় স্থগিত পরীক্ষাগুলো নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷ ৫. কোনো পূর্বঘোষণা বা নোটিশ ছাড়া হঠাৎ করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধরনে যে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় শিক্ষার্থীদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল; সে বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে খাতা মূল্যায়ন ও নম্বর প্রদান করতে হবে৷ ৬. পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রগুলোতে ‘সচেতন গার্ড’-এর নামে কিছু শিক্ষকের অতিরিক্ত কঠোর, অহেতুক ও বিভ্রান্তিকর আচরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা ভীতিতে না পড়ে৷
আন্দোলনের পটভূমি ও অবসান: উল্লেখ্য, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও তীব্র বৃষ্টির মধ্যে জোরপূর্বক এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ এবং আন্দোলনে নামা পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ সম্বোধন করা হয়েছে এমন তীব্র অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) থেকে ঢাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন আসছিল শিক্ষার্থীরা৷ আজ বুধবার দ্বিতীয় দিনের আন্দোলনে সকাল থেকেই সায়েন্সল্যাব ও উত্তরা অবরুদ্ধ থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যা সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছিল৷ তবে বিকেল ৫টায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য সচিবালয়ে প্রবেশ করার পর রাজপথের উত্তেজনা অনেকটাই কমে আসে এবং সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে৷ এখন সবার চোখ সচিবালয়ের ভেতরে চলমান শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের সিদ্ধান্তের দিকে৷
